
নওগাঁর পত্নীতলায় ধর্মীয় আচার, নৃত্য-গীত ও নানা লোকজ আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব। কারাম ডালকে কেন্দ্র করে পূজা, উপবাস, কিচ্ছা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের নানা দিক তুলে ধরেন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষজন।
বুধবার বিকেলে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। এতে পত্নীতলা ছাড়াও মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও ধামইরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।
এর আগে মঙ্গলবার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজার মূল আয়োজন। দিনভর উপবাস পালনের পর সন্ধ্যায় একদল কিশোরী কারামগাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। এরপর দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গের মাধ্যমে শুরু হয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এ সময় পুরোহিতের কিচ্ছায় উঠে আসে কার্মা ও ধার্মা দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানান এবং উপবাস ভঙ্গ করেন। পরে কারাম ডালকে ঘিরে ঢাক, মাদল ও করতালের তালে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান।
বুধবার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে গীত পরিবেশন করতে করতে কারাম ডাল নিয়ে যাওয়া হয় নজিপুর হাইস্কুল মাঠে। সেখানে কারাম ডাল স্থাপনের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাংস্কৃতিক দলগুলো নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করে। নাচ-গান ও লোকজ পরিবেশনায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।
পরে কারাম ডাল তুলে আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম একটি ফসলকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে আয়োজিত এ উৎসবকে অনেকেই ‘ডালপূজা’ নামে অভিহিত করেন। কারাম বৃক্ষের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। উৎসবের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জমির উর্বরতা, ভালো ফলন ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করা হয়।
উৎসবে অংশ নেওয়া বুজরুক গ্রামের বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা এবং ধরনাই বিজিপাড়ার সবিতা কুজুরসহ কয়েকজন নারী জানান, একসময় প্রায় প্রতিবছরই গ্রামে কারাম উৎসবের আয়োজন করা হতো। তবে বর্তমানে আয়োজনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছর উৎসব করা সম্ভব হয় না। সহযোগিতা পাওয়া গেলে আবারও উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনরাও অংশ নিতে আসেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। পাশাপাশি এই উৎসব প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আধুনিকতার প্রভাবের মধ্যেও প্রাচীন এই ঐতিহ্য ধরে রাখা প্রয়োজন।
পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, নওগাঁর প্রায় সব উপজেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী আয়োজনগুলোর মধ্যে কারাম পূজা অন্যতম।
অনুষ্ঠানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খান জোহা, পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা, চলচ্চিত্রশিল্পী ড্যানি সিডাক, অনানুষ্ঠানিক খাত শিল্প দক্ষতা পরিষদের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকদের ভাষ্য, কারাম উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার বা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নাচ, গান ও লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
অধিকার ডেস্কঃ 
























