
প্রতিবছরের মতো এবারও ডেঙ্গু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নাগরিক সচেতনতার পরীক্ষা নিচ্ছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৭৯ হাজার ৬২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ২৪৫ জন। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে, উৎকণ্ঠা আছে, কখনো অপূরণীয় ক্ষতি আছে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবহেলা এবং ভুল ধারণা। হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতাকে অনেকেই সাধারণ জ্বর ভেবে ফেলে রাখেন। আবার কেউ কেউ জ্বর হলেই ধরে নেন ডেঙ্গু হয়েছে এবং নিজেই ওষুধ খেতে শুরু করেন। দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ। জ্বর শুরু হলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
ভুল ধারণা ভাঙা জরুরি
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং বিপদচিহ্নের দিকে নজর রাখাই চিকিৎসার ভিত্তি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর ও ব্যথায় প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ নিজে থেকে খাওয়া উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্লাটিলেট নিয়ে আতঙ্কও অনেক সময় অকারণে বাড়ে। রোগীর অবস্থা বোঝার জন্য শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। রক্তচাপ, নাড়ির গতি, প্রস্রাবের পরিমাণ ও রক্তক্ষরণের লক্ষণসহ সামগ্রিক অবস্থা দেখা জরুরি। পেঁপেপাতার রস প্লাটিলেট বাড়ায়, এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এ ধরনের প্রচলিত বিশ্বাস ঠেকাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
কখন হাসপাতালে যেতে হবে
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, কালো বা রক্তমিশ্রিত পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়া, এসব লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না। এ ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই জীবন রক্ষার প্রধান উপায়।
রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব
ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ডেঙ্গু আর শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়, বিভিন্ন জেলায়ও সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান চালানো দরকার। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, স্যালাইন, পরীক্ষার সুবিধা ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। মৌসুম শুরুর আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে প্রতিবছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
নাগরিকেরও ভূমিকা আছে
বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণসামগ্রীতে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নিজের আঙিনা পরিষ্কার রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। একজনের অসচেতনতা পুরো পাড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় তিনটি বিষয় অপরিহার্য: সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ, বিপদচিহ্ন চিনে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সম্মিলিত উদ্যোগ। আতঙ্ক নয়, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই সংকট থেকে আমাদের রক্ষা করতে।
মোঃহুমায়ন কবির (আলীফুর) 





















