ঢাকা ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
দুই পোশাক কারখানায় ১০২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন একই সড়ক একদিনে দুইবার উদ্বোধন, সকালে জামায়াতের এমপি ও বিকেলে বিএনপির সাবেক এমপি ইবিতে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ১২ বিভাগের ২৪ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল ইবিতে প্রয়াত শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম সৈকতের জন্য দোয়া মাহফিল দুই অভিযানে ২৩৪ বোতল বিদেশি মদ ও ১০৩ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৩, জব্দ প্রাইভেট কার বেরোবিতে ক্যারিয়ার-ভার্সের প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন, সভাপতি লাবণ্য ও সম্পাদক মোবাশ্বির কালিয়াকৈরে বেতন ৩০ হাজারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ, ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন মেসির গোল ও অ্যাসিস্টে নিউ ইংল্যান্ডকে হারাল ইন্টার মায়ামি আমুসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ ৭ নেতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ শ্রমিক আন্দোলনে জামায়াত-আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রাশেদ খাঁনের
ডেঙ্গু অভিযানে মিলল মানবিকতার দৃষ্টান্ত

৭৫ বছরের রোকেয়ার ঘরে পানির সংযোগ দিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা প্রশাসক উজ্জল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ৭৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ স্থাপন করা হয়। আজ বিকালে তোলা ছবি

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে এক প্রবীণ নারীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। বাড়িতে টিউবওয়েল থাকলেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তা থেকে পানি তুলতে পারতেন না ৭৫ বছর বয়সী বিধবা রোকেয়া বেগম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে কখনো বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখতেন, আবার কখনো প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পানি সংগ্রহ করতেন। তাঁর এই অসহায়ত্বের কথা জানার পর মানবিক উদ্যোগ নেয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা। পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষের উদ্যোগে পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে রোকেয়া বেগমের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে সরবরাহ লাইনের নতুন পানির সংযোগ।

রোববার (১৮ অক্টোবর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার উপর রাজারামপুর এলাকার কুমারপাড়ায় রোকেয়া বেগমের বাড়িতে এ সংযোগ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট লাঘবে নেওয়া এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ববোধেরও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের অভিযানেই সামনে আসে বৃদ্ধার দুর্ভোগ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংসের লক্ষ্যে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে পৌরসভার টিম-৪। এরই অংশ হিসেবে উপর রাজারামপুরের কুমারপাড়া এলাকায় অভিযান চালানোর সময় একটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার বিষয়টি নজরে আসে দলের সদস্যদের। সেখানে জমে থাকা পানিতে পোকামাকড় ও মশার উপস্থিতিও দেখা যায়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। তবে রোকেয়া বেগমের বাড়ির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারেন, পানি জমিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে তাঁর শারীরিক অক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের অসহায়ত্ব।

বাড়িতে টিউবওয়েল থাকলেও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি চেপে পানি তোলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতেন তিনি। বর্ষার বাইরে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভর করতে হতো তাঁকে। খাবার তৈরি, গোসল ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে পানির ব্যবস্থা করা তাঁর জন্য ছিল কষ্টসাধ্য।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ৭৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ স্থাপন করা হয়। এসময় সংবাদিক ও পৌরসভার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

অর্থাৎ, ডেঙ্গু প্রতিরোধের অভিযানে যে জমে থাকা পানি প্রথমে একটি জনস্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছিল, অনুসন্ধানে তার পেছনে পাওয়া যায় একজন প্রবীণ নারীর মৌলিক সেবা পাওয়ার সংকট। বিষয়টি উপলব্ধি করে পৌরসভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেন।

সাংবাদিক ও পৌর কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রশাসকের নজরে

রোকেয়া বেগমের দুর্ভোগের বিষয়টি দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মোঃ ইমরান হোসেন পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষকে জানান। বিষয়টি জানার পর তিনি বৃদ্ধার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ বলেন, বর্তমানে পৌর এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রোকেয়া বেগমের দুর্ভোগের বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী ও পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মোঃ ইমরান হোসেন তাঁকে বিষয়টি জানান।

তিনি বলেন, “৭৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমের এমন কষ্টের বিষয়টি আমার কাছে খুবই বেদনাদায়ক মনে হয়েছে। বাড়িতে টিউবওয়েল থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি পানি তুলতে পারছিলেন না। বিষয়টি জানার পর পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে তাঁর বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

পৌর প্রশাসকের এই উদ্যোগে রোকেয়া বেগমের দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগে পানি সংগ্রহের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন তাঁর বাড়িতেই সরবরাহ লাইনের মাধ্যমে পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শুধু পানির সংযোগ নয়, স্বস্তি ফিরল দৈনন্দিন জীবনে

পানি মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম। কিন্তু বয়স, অসুস্থতা কিংবা শারীরিক অক্ষমতার কারণে অনেক প্রবীণ মানুষের জন্য নিজের বাড়িতে থাকা পানির উৎস ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। রোকেয়া বেগমের ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

একজন সুস্থ-সবল মানুষের কাছে টিউবওয়েল থেকে পানি তোলা হয়তো খুবই সাধারণ কাজ। কিন্তু শারীরিকভাবে অক্ষম একজন প্রবীণ নারীর কাছে একই কাজ হয়ে উঠতে পারে প্রতিদিনের বড় বাধা। সেই বাধার কারণে তাঁকে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে পানি চাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এ অবস্থায় তাঁর বাড়িতে সরবরাহ লাইনের নতুন সংযোগ স্থাপন শুধু একটি অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার একটি বাস্তব উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রবীণ, বিধবা, অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম নাগরিকদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগী হলে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।

পানির নতুন সংযোগ পেয়ে রোকেয়া বেগম পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে পাশে দাঁড়ানোয় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতার পাশাপাশি সমস্যার সমাধান

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনসচেতনতামূলক অভিযান পরিচালনার সময় কোনো বাড়িতে পানি জমিয়ে রাখার পেছনে বাস্তব কোনো সংকট রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

রোকেয়া বেগমের বাড়িতে জমে থাকা পানি ছিল ডেঙ্গুর ঝুঁকির একটি সম্ভাব্য উৎস। কিন্তু শুধু পানি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দিলে তাঁর দৈনন্দিন পানির সংকটের স্থায়ী সমাধান হতো না। বরং সমস্যাটির কারণ চিহ্নিত করে বিকল্প পানির ব্যবস্থা করায় একদিকে যেমন তাঁর প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার প্রয়োজনও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ঘটনা জনস্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে। নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি তাঁদের বাস্তব সমস্যা বোঝা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে জনসেবামূলক কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।

জনসেবায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক উদাহরণ

নগর পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব কার্যক্রমের সাফল্য শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা সেবা সম্প্রসারণের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব সুফল পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ দেখিয়েছে, একটি নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্য দিয়েও নাগরিকের ব্যক্তিগত সংকট চিহ্নিত করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সমস্যাটি প্রশাসনের নজরে আনায় এবং পৌর প্রশাসক উদ্যোগ নেওয়ায় একজন অসহায় প্রবীণ নারী প্রয়োজনীয় পানির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে প্রবীণ ও অসহায় নাগরিকদের সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জনসেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তেও সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক সেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এবং শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।

রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রতিনিধি মোঃ সেরাজুল ইসলাম ও মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানসহ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

একজন প্রবীণ নারীর পানির কষ্ট লাঘবে নেওয়া এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধের একটি অভিযান পেয়েছে মানবিক মাত্রা। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, জনসেবার প্রকৃত সার্থকতা শুধু সমস্যা চিহ্নিত করায় নয়, বরং সেই সমস্যার পেছনের কারণ বুঝে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত। রোকেয়া বেগমের ঘরে পৌঁছে যাওয়া পানির সংযোগ তাই তাঁর দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরানোর পাশাপাশি মানবিক জনসেবারও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুই পোশাক কারখানায় ১০২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন

ডেঙ্গু অভিযানে মিলল মানবিকতার দৃষ্টান্ত

৭৫ বছরের রোকেয়ার ঘরে পানির সংযোগ দিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা প্রশাসক উজ্জল

প্রকাশের সময়ঃ ০৬:৪৬:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে এক প্রবীণ নারীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। বাড়িতে টিউবওয়েল থাকলেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তা থেকে পানি তুলতে পারতেন না ৭৫ বছর বয়সী বিধবা রোকেয়া বেগম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে কখনো বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখতেন, আবার কখনো প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পানি সংগ্রহ করতেন। তাঁর এই অসহায়ত্বের কথা জানার পর মানবিক উদ্যোগ নেয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা। পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষের উদ্যোগে পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে রোকেয়া বেগমের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে সরবরাহ লাইনের নতুন পানির সংযোগ।

রোববার (১৮ অক্টোবর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার উপর রাজারামপুর এলাকার কুমারপাড়ায় রোকেয়া বেগমের বাড়িতে এ সংযোগ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট লাঘবে নেওয়া এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ববোধেরও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের অভিযানেই সামনে আসে বৃদ্ধার দুর্ভোগ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংসের লক্ষ্যে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে পৌরসভার টিম-৪। এরই অংশ হিসেবে উপর রাজারামপুরের কুমারপাড়া এলাকায় অভিযান চালানোর সময় একটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার বিষয়টি নজরে আসে দলের সদস্যদের। সেখানে জমে থাকা পানিতে পোকামাকড় ও মশার উপস্থিতিও দেখা যায়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। তবে রোকেয়া বেগমের বাড়ির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারেন, পানি জমিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে তাঁর শারীরিক অক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের অসহায়ত্ব।

বাড়িতে টিউবওয়েল থাকলেও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি চেপে পানি তোলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতেন তিনি। বর্ষার বাইরে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভর করতে হতো তাঁকে। খাবার তৈরি, গোসল ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে পানির ব্যবস্থা করা তাঁর জন্য ছিল কষ্টসাধ্য।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ৭৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ স্থাপন করা হয়। এসময় সংবাদিক ও পৌরসভার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

অর্থাৎ, ডেঙ্গু প্রতিরোধের অভিযানে যে জমে থাকা পানি প্রথমে একটি জনস্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছিল, অনুসন্ধানে তার পেছনে পাওয়া যায় একজন প্রবীণ নারীর মৌলিক সেবা পাওয়ার সংকট। বিষয়টি উপলব্ধি করে পৌরসভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেন।

সাংবাদিক ও পৌর কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রশাসকের নজরে

রোকেয়া বেগমের দুর্ভোগের বিষয়টি দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মোঃ ইমরান হোসেন পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষকে জানান। বিষয়টি জানার পর তিনি বৃদ্ধার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ বলেন, বর্তমানে পৌর এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রোকেয়া বেগমের দুর্ভোগের বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী ও পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মোঃ ইমরান হোসেন তাঁকে বিষয়টি জানান।

তিনি বলেন, “৭৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমের এমন কষ্টের বিষয়টি আমার কাছে খুবই বেদনাদায়ক মনে হয়েছে। বাড়িতে টিউবওয়েল থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি পানি তুলতে পারছিলেন না। বিষয়টি জানার পর পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে তাঁর বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

পৌর প্রশাসকের এই উদ্যোগে রোকেয়া বেগমের দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগে পানি সংগ্রহের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন তাঁর বাড়িতেই সরবরাহ লাইনের মাধ্যমে পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শুধু পানির সংযোগ নয়, স্বস্তি ফিরল দৈনন্দিন জীবনে

পানি মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম। কিন্তু বয়স, অসুস্থতা কিংবা শারীরিক অক্ষমতার কারণে অনেক প্রবীণ মানুষের জন্য নিজের বাড়িতে থাকা পানির উৎস ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। রোকেয়া বেগমের ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

একজন সুস্থ-সবল মানুষের কাছে টিউবওয়েল থেকে পানি তোলা হয়তো খুবই সাধারণ কাজ। কিন্তু শারীরিকভাবে অক্ষম একজন প্রবীণ নারীর কাছে একই কাজ হয়ে উঠতে পারে প্রতিদিনের বড় বাধা। সেই বাধার কারণে তাঁকে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে পানি চাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এ অবস্থায় তাঁর বাড়িতে সরবরাহ লাইনের নতুন সংযোগ স্থাপন শুধু একটি অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার একটি বাস্তব উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রবীণ, বিধবা, অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম নাগরিকদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগী হলে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।

পানির নতুন সংযোগ পেয়ে রোকেয়া বেগম পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে পাশে দাঁড়ানোয় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতার পাশাপাশি সমস্যার সমাধান

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনসচেতনতামূলক অভিযান পরিচালনার সময় কোনো বাড়িতে পানি জমিয়ে রাখার পেছনে বাস্তব কোনো সংকট রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

রোকেয়া বেগমের বাড়িতে জমে থাকা পানি ছিল ডেঙ্গুর ঝুঁকির একটি সম্ভাব্য উৎস। কিন্তু শুধু পানি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দিলে তাঁর দৈনন্দিন পানির সংকটের স্থায়ী সমাধান হতো না। বরং সমস্যাটির কারণ চিহ্নিত করে বিকল্প পানির ব্যবস্থা করায় একদিকে যেমন তাঁর প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার প্রয়োজনও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ঘটনা জনস্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে। নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি তাঁদের বাস্তব সমস্যা বোঝা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে জনসেবামূলক কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।

জনসেবায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক উদাহরণ

নগর পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব কার্যক্রমের সাফল্য শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা সেবা সম্প্রসারণের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব সুফল পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ দেখিয়েছে, একটি নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্য দিয়েও নাগরিকের ব্যক্তিগত সংকট চিহ্নিত করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সমস্যাটি প্রশাসনের নজরে আনায় এবং পৌর প্রশাসক উদ্যোগ নেওয়ায় একজন অসহায় প্রবীণ নারী প্রয়োজনীয় পানির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে প্রবীণ ও অসহায় নাগরিকদের সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জনসেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তেও সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক সেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এবং শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।

রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রতিনিধি মোঃ সেরাজুল ইসলাম ও মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানসহ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

একজন প্রবীণ নারীর পানির কষ্ট লাঘবে নেওয়া এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধের একটি অভিযান পেয়েছে মানবিক মাত্রা। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, জনসেবার প্রকৃত সার্থকতা শুধু সমস্যা চিহ্নিত করায় নয়, বরং সেই সমস্যার পেছনের কারণ বুঝে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত। রোকেয়া বেগমের ঘরে পৌঁছে যাওয়া পানির সংযোগ তাই তাঁর দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরানোর পাশাপাশি মানবিক জনসেবারও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।