
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও টেকনিশিয়ানের অভাবে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না। ফলে ঘেরে ছাড়ার আগে চিংড়ির রেণুর গুণগত মান ও ভাইরাস পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাতক্ষীরার চাষিরা। বাধ্য হয়ে পরীক্ষাবিহীন পোনা কিনে ঘেরে ছাড়ছেন তাঁরা। এতে ভাইরাসের সংক্রমণ ও চিংড়ির মড়কে বারবার লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা। তাঁদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি ভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়িশিল্প ও অর্থনীতি আরও সংকটে পড়বে।
জেলা মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বরে সাতক্ষীরার এল্লারচর এলাকায় অবস্থিত চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি অত্যাধুনিক রেণু পরীক্ষা ও পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) ল্যাব স্থাপন করা হয়। ঘেরে ছাড়ার আগে চিংড়ির পোনায় রোগজীবাণুর উপস্থিতি ও গুণগত মান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাই করার সুযোগ তৈরি করাই ছিল এসব ল্যাব স্থাপনের উদ্দেশ্য।
কিন্তু উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে ল্যাব দুটি চালু করা যায়নি। সেখানে টেকনিশিয়ান ও দক্ষ কর্মী নিয়োগ না হওয়ায় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং রাসায়নিক উপকরণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় এসব সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি ও উপকরণের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরীক্ষাবিহীন পোনায় বাড়ছে চাষের ঝুঁকি
সাতক্ষীরা দেশের বাগদা চিংড়ি চাষের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৫৫ হাজার ঘেরে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়। প্রতি মৌসুমে এসব ঘেরে ৩০০ কোটিরও বেশি রেণু পোনা ছাড়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কিন্তু পরীক্ষাগার চালু না থাকায় চাষিরা বাজার থেকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়াই পোনা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে পোনায় ভাইরাস বা অন্য রোগজীবাণুর উপস্থিতি আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। চাষিদের অভিযোগ, ঘেরে পোনা ছাড়ার কিছুদিন পর সেগুলো বড় হতে শুরু করলেও হঠাৎ মড়ক দেখা দেয়। এতে একের পর এক ঘেরের চিংড়ি মারা যায় এবং বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তাঁরা।
ধারাবাহিক লোকসানে অনেক চাষি তাঁদের বিনিয়োগ করা পুঁজি হারিয়েছেন। কেউ কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করার পরিস্থিতিতে পড়েছেন। লোকসান সামলাতে না পেরে অনেকেই চিংড়ি চাষ বন্ধ করে সাদা মাছ উৎপাদন কিংবা ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি
সাতক্ষীরা চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম জানান, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত খামারটি স্থানীয় মৎস্য অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আধুনিক পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা না যাওয়ায় সেগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগের জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জেলা মৎস্য বিভাগ নিশ্চিত করেছে।
দ্রুত ল্যাব চালুর দাবি
চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত চিংড়িশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে রেণুর ভাইরাস পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য দ্রুত টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়ে ল্যাব দুটি চালু করার দাবি জানান তিনি।
তাঁর আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একদিকে চিংড়ি চাষিরা আর্থিকভাবে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থে কেনা প্রায় ৮ কোটি টাকার যন্ত্রপাতিও অকেজো হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে পিসিআর ও রেণু পরীক্ষার ল্যাব দুটিতে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় চাষি ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পরীক্ষাগার দুটি সচল হলে ঘেরে ছাড়ার আগেই পোনার গুণগত মান ও রোগজীবাণুর উপস্থিতি যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে চাষের ঝুঁকি কমানো এবং উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়িশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করা যেতে পারে।
অধিকার ডেস্কঃ 




















