
সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তথ্য খোঁজেন, ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং যা দেখেন তা মানুষের সামনে তুলে ধরেন। অথচ বাংলাদেশে এই স্বাভাবিক পেশাগত কাজই বারবার সাংবাদিকদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। হুমকি, হামলা, ক্যামেরা ভাঙচুর, সংবাদ সংগ্রহে বাধা, মামলা কিংবা আটক—পদ্ধতি বদলালেও বার্তাটি একই: প্রশ্ন করো না, দেখো না, লিখো না। এটি শুধু সাংবাদিকের সমস্যা নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার সংকুচিত হওয়ার সংকেত।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের (HRSS) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৯৭ জন আহত, ৭৭ জন হুমকির মুখে এবং ২০ জন আটক হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়ার সংখ্যা ৫২ শতাংশ বেড়েছে।
পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেই স্পষ্ট। ৪ নভেম্বর সাভারের হেমায়েতপুরে শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক আক্রান্ত হন, ভাঙচুর করা হয় তাঁদের ক্যামেরাও। এর এক মাস আগে, ৪ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। ঘটনার পর মামলা হলেও ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আহত সাংবাদিকেরা হুমকি পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। এ দুই ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: মামলা হওয়াই কি বিচার, নাকি দৃশ্যমান জবাবদিহিই প্রকৃত প্রতিকার?
সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে সাংবাদিককে ‘নিজের পক্ষে’ বা ‘বিপক্ষে’ ভাগ করার সংস্কৃতি। কোনো প্রতিবেদন পছন্দ না হলে তথ্য দিয়ে প্রতিবাদ করা যায়, সংশোধনী চাওয়া যায়, আইনি প্রতিকারও নেওয়া যায়। কিন্তু সংবাদ অপছন্দ হয়েছে বলে সাংবাদিকের ওপর হামলার অধিকার কারও নেই। সম্পাদক পরিষদও বলেছে, কোনো সংবাদ, মতামত বা সাংবাদিকের পেশাগত কাজ নিয়ে মতভেদ হামলা, হুমকি বা বাধাদানের বৈধতা দেয় না।
শুধু রাজনৈতিক কর্মী বা বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনি প্রক্রিয়াও সাংবাদিকের স্বাধীনতার পরীক্ষার মুখে। ৪ নভেম্বর সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও ডিবিসি নিউজের সাংবাদিক রাজিব ঘোষকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরদিন ইকবাল সোবহানকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। রাজিব ঘোষকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন আইএফজে (IFJ) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ আদালতের বিষয়। তবে সাংবাদিককে আটক বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতার সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান স্বস্তিদায়ক নয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (RSF) ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। দেশের স্কোর ৩৩.০৫, যা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ (very serious) শ্রেণিতে পড়ে। সাংবাদিক নিরাপত্তা সূচকে অবস্থান আরও নিচে, ১৬১তম। এ ছাড়া কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) ২০২৬ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়নের ধারাবাহিকতা ভাঙার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা ও নিপীড়নের চক্রও বদলানো জরুরি।
তাই সমাধানও হতে হবে দৃশ্যমান। সাংবাদিক আক্রান্ত হলে মামলা দায়ের করাই শেষ কথা নয়। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান, অভিযুক্তদের শনাক্তকরণ, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ—এই চারটি ধাপ বাধ্যতামূলক করা দরকার। রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনোভাবেই বিচারপ্রক্রিয়ার ঢাল না হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ভিডিও ফুটেজে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার দাবি থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তারে বিলম্বের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু একটি মামলার দুর্বলতা নয়, বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। ইউনেসকোর (UNESCO) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ সময়ে বিশ্বে সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দায়মুক্তির হার ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অপরাধের বিচার না হওয়াই সাংবাদিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি।
সাংবাদিককে নিরাপদ রাখা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার পূর্বশর্ত। সাংবাদিকের ক্যামেরা ভাঙলে হারিয়ে যায় একটি দৃশ্য, তাঁকে ভয় দেখালে হারায় একটি অনুসন্ধান, আর তাঁকে চুপ করিয়ে দিলে হারিয়ে যায় সমাজের একটি সত্য।
তাই প্রশ্নটি এখন শুধু এটুকু নয় যে সাংবাদিকদের হেনস্তা থামবে কবে। প্রশ্ন আরও কঠিন: যে দেশে প্রশ্ন করাই ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি করবে কে?
মুহিবুল হাসান রাফি গণমাধ্যমকর্মী (রিপোর্টার - চট্টগ্রাম পোস্ট) 
























