ঢাকা ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
মিমাংসার নামে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

১০ লাখে মীমাংসা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় ৫ লাখ গায়েব!

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা। ফাইল ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি প্রতারণা মামলার সমঝোতার ১০ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা পুলিশের পকেটে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সদর মডেল থানার এএসআই নজরুলের বিরুদ্ধে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন মামলার বাদী। একই ঘটনায় তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নূর ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার বা এড়িয়ে গেছেন।

মামলার পটভূমি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিমোড় এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল জলিল (৩২) কানাডায় ওয়ার্ক পারমিট ভিসা দেওয়ার প্রলোভনে ১৫ লাখ টাকা দেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার দুই ব্যক্তি-রাজু ও নাজুকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে এই লেনদেন হয়। মোট চুক্তি ছিল ১৮ লাখ টাকা।

টাকা নেওয়ার পরও বিদেশ পাঠানোর অগ্রগতি না দেখে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পারেন জলিল। একপর্যায়ে তিনি সদর মডেল থানায় মামলা করতে গেলে ‘মামলা রেকর্ড’ খরচের নামে দুই দফায় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অবশেষে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতারণা মামলা (নম্বর-০৭) রেকর্ড হয়।

গ্রেপ্তার ও সমঝোতা-

পরে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ কিশোরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে রাজু ও নাজুকে আটক করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আনে। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বসে ১০ লাখ টাকায় মীমাংসা হয় এবং এফিডেভিট স্বাক্ষরিত হয়।

বাদীর অভিযোগ, সমঝোতার পুরো ১০ লাখ টাকার মধ্যে তাঁকে দেওয়া হয় ৫ লাখ টাকা। বাকি ৫ লাখ টাকা এএসআই নজরুল রেখে দেন। যদিও পূর্বে নেওয়া ২০ হাজার টাকা পরে ফেরত দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, সমঝোতার সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়া তাঁদের তত্ত্বাবধানেই হয়। তবে বাদী বলেন, “ঋণের চাপে নিরুপায় হয়ে অর্ধেক টাকা নিয়েই বাড়ি ফিরেছি। পুরো টাকা পেলে ঋণের বোঝা অনেকটাই কমতো।”

‘গ্রুপ করে কাজ’—অভিযোগ

একটি সূত্রের দাবি, সদর থানায় নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করেন এবং সংবেদনশীল মামলাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

এব্যাপারে এএসআই নজরুল এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,

 প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষের আলোচনায় ১০ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে। তবে সমঝোতার টাকার অর্ধেক রাখার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার কর্মরত এএসআই নজরুল।

এসআই নূর ইসলাম জানান, তিনি আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছেন। সমঝোতা বা টাকার লেনদেন সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন।

প্রতারণা মামলার সমঝোতার ১০ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা পুলিশের পকেটে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কোনো সদস্য অন্যায় বা অপকর্মে জড়িত থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঘটনার সত্যতা যাচাই ও অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি। সমঝোতার নামে যদি অর্থ লোপাট হয়ে থাকে, তবে তা শুধু এক ব্যক্তির ক্ষতি নয়—আইনের প্রতি জনআস্থার বড় ধাক্কা। (চলবে)

জনপ্রিয় সংবাদ

মিমাংসার নামে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

১০ লাখে মীমাংসা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় ৫ লাখ গায়েব!

প্রকাশের সময়ঃ ১২:৪১:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি প্রতারণা মামলার সমঝোতার ১০ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা পুলিশের পকেটে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সদর মডেল থানার এএসআই নজরুলের বিরুদ্ধে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন মামলার বাদী। একই ঘটনায় তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নূর ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার বা এড়িয়ে গেছেন।

মামলার পটভূমি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিমোড় এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল জলিল (৩২) কানাডায় ওয়ার্ক পারমিট ভিসা দেওয়ার প্রলোভনে ১৫ লাখ টাকা দেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার দুই ব্যক্তি-রাজু ও নাজুকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে এই লেনদেন হয়। মোট চুক্তি ছিল ১৮ লাখ টাকা।

টাকা নেওয়ার পরও বিদেশ পাঠানোর অগ্রগতি না দেখে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পারেন জলিল। একপর্যায়ে তিনি সদর মডেল থানায় মামলা করতে গেলে ‘মামলা রেকর্ড’ খরচের নামে দুই দফায় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অবশেষে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতারণা মামলা (নম্বর-০৭) রেকর্ড হয়।

গ্রেপ্তার ও সমঝোতা-

পরে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ কিশোরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে রাজু ও নাজুকে আটক করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আনে। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বসে ১০ লাখ টাকায় মীমাংসা হয় এবং এফিডেভিট স্বাক্ষরিত হয়।

বাদীর অভিযোগ, সমঝোতার পুরো ১০ লাখ টাকার মধ্যে তাঁকে দেওয়া হয় ৫ লাখ টাকা। বাকি ৫ লাখ টাকা এএসআই নজরুল রেখে দেন। যদিও পূর্বে নেওয়া ২০ হাজার টাকা পরে ফেরত দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, সমঝোতার সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়া তাঁদের তত্ত্বাবধানেই হয়। তবে বাদী বলেন, “ঋণের চাপে নিরুপায় হয়ে অর্ধেক টাকা নিয়েই বাড়ি ফিরেছি। পুরো টাকা পেলে ঋণের বোঝা অনেকটাই কমতো।”

‘গ্রুপ করে কাজ’—অভিযোগ

একটি সূত্রের দাবি, সদর থানায় নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করেন এবং সংবেদনশীল মামলাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

এব্যাপারে এএসআই নজরুল এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,

 প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষের আলোচনায় ১০ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে। তবে সমঝোতার টাকার অর্ধেক রাখার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার কর্মরত এএসআই নজরুল।

এসআই নূর ইসলাম জানান, তিনি আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছেন। সমঝোতা বা টাকার লেনদেন সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন।

প্রতারণা মামলার সমঝোতার ১০ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা পুলিশের পকেটে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কোনো সদস্য অন্যায় বা অপকর্মে জড়িত থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঘটনার সত্যতা যাচাই ও অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি। সমঝোতার নামে যদি অর্থ লোপাট হয়ে থাকে, তবে তা শুধু এক ব্যক্তির ক্ষতি নয়—আইনের প্রতি জনআস্থার বড় ধাক্কা। (চলবে)