ঢাকা ১০:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
দাম কমার পর যে দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে সোনার ভরি গাইবান্ধায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শিবলু গ্রেপ্তার জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্রদ্ধা আজ ছয় ঘণ্টা টোল ফ্রি থাকবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ঘুমের সময়ে অনিয়ম থাকলে বাড়ে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি, বলছে নতুন গবেষণা ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির সাংবাদিক হেনস্তা: প্রশ্ন করাই কি অপরাধ? জাতীয় স্নাতক গণিত অলিম্পিয়াডের দিনাজপুর অঞ্চলে সেরা ১০-এ বেরোবির ৫ শিক্ষার্থী শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মহিলাদলের সভা আয়োজন, বাগাতিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির দুঃখ প্রকাশ

মার্কিন সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইসরাইলের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০৭:৪৫:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • ১২৩৫ Time View

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশটির সঙ্গে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রতি কঠোর অবস্থানের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, গাজা ও ইরান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে মার্কিন নাগরিকদের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সৌদি সংবাদমাধ্যম আশরক আল-আওসাতের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। দেশটির গণপরিবহনের বাসে এখনো নেতানিয়াহু, ট্রাম্প ও যুদ্ধবিমানের ছবি সংবলিত বড় পোস্টার দেখা যাচ্ছে। এসব পোস্টারে ইরানে যৌথ হামলার প্রসঙ্গ তুলে দুই নেতার সম্পর্কের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

নেতানিয়াহুর অনিশ্চিত নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের সমর্থন কমেছে এবং ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নির্বাচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কংগ্রেস ইরান, গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়েল স্টার্নহেল বলেন, এটি একটি নতুন যুগের সূচনা। গাজা ও ইরান যুদ্ধের সম্মিলিত প্রভাব মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও তা দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভোটারদের আবার দলে ফেরানোর কয়েকটি উপায় তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পও এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেননি। ভোট গ্রহণের দিন মঙ্গলবার তিনি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি একমত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেন।

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রায় দুই দশক ধরে কয়েক দফায় ক্ষমতায় রয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থন পেতে তিনি জোর প্রচেষ্টা চালালেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হলে তা এড়াতে ইসরাইলের ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকে পড়া উচিত।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল কিংবা সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে নেতানিয়াহু এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত আমিত সেগাল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ইসরাইলের জন্য ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

আইজেনকট কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারবেন?

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী জোট গঠনের চেষ্টা করছেন গাদি আইজেনকট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন।

এক বিবৃতিতে সাবেক এই সামরিক প্রধান বলেন, তিনি উদারনৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে কাজ করতে চান।

আইজেনকটের জোটের বামপন্থী নেতা ইয়ার গোলানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের দ্বিদলীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, নেতানিয়াহু এই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও তোলেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের বিরোধিতা করাকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বারাক ওবামাও রয়েছেন, যিনি এখনো অনেক ডেমোক্র্যাটের কাছে জনপ্রিয়। প্রায় এক দশক আগে ইরান বিষয়ে ওবামার কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করতে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন।

ইয়েল স্টার্নহেলের মতে, নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাটদের বিরক্ত করেছেন এবং তাঁদের দূরে সরিয়ে দিতে সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন। তবে আইজেনকট শুধু নেতানিয়াহুর তুলনায় ভিন্ন ব্যক্তি হলেই নতুন কংগ্রেসের কাছ থেকে ইতিবাচক আচরণ পাবেন না। এর জন্য তাঁকে নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে।

স্টার্নহেল আরও বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো উগ্রপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আইজেনকট ইসরাইলের সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে পারেন।

তবে ইসরাইলি সমাজের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গাজা যুদ্ধের শুরুতে দেশটির জনগণের মধ্যে এ যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক সমর্থনও ছিল।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে মার্কিন সমালোচনা বাড়ছে

নতুন মার্কিন কংগ্রেসে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের উপস্থিতি ইসরাইলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে আব্দুল এল-সায়েদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে পরিচিত। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে তিনি গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ইসরাইল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে থাকা ইসরাইলি গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক কো-অপারেশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক পরিচালক এলি কোয়াজ বলেন, নেতানিয়াহু শুধু রিপাবলিকানদের ওপর নয়, ব্যক্তিগতভাবেও ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করেছিলেন।

তাঁর মতে, নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, সেই রাজনৈতিক সমর্থনেরও সীমা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের সংকট শুধু ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক গবেষক এহুদ এলিয়ামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াও ইসরাইলের নিজস্ব বড় অস্ত্রশিল্প রয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশটি সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে ইসরাইলকে তুলনামূলক সস্তা কামানের গোলা ও কম উন্নত বোমার ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

এহুদ এলিয়াম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বড় অংশ, এমনকি পুরো সহায়তা হারানোর মতো পরিস্থিতির সঙ্গেও ইসরাইলকে মানিয়ে নিতে হবে। তবে তা দেশটির জন্য কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া কিংবা কর বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত বিবেচনা করতে হতে পারে।

অন্যদিকে, এলি কোয়াজের মতে, আইজেনকট যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধাবস্থার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত চুক্তিকে গুরুত্ব দিতে চান।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন, গাজা ও ইরান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি নতুন নেতৃত্বের অধীনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা হবে—তা নির্ভর করবে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দুই দেশের ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

দাম কমার পর যে দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে সোনার ভরি

মার্কিন সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইসরাইলের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

প্রকাশের সময়ঃ ০৭:৪৫:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রতি কঠোর অবস্থানের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, গাজা ও ইরান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে মার্কিন নাগরিকদের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সৌদি সংবাদমাধ্যম আশরক আল-আওসাতের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। দেশটির গণপরিবহনের বাসে এখনো নেতানিয়াহু, ট্রাম্প ও যুদ্ধবিমানের ছবি সংবলিত বড় পোস্টার দেখা যাচ্ছে। এসব পোস্টারে ইরানে যৌথ হামলার প্রসঙ্গ তুলে দুই নেতার সম্পর্কের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

নেতানিয়াহুর অনিশ্চিত নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের সমর্থন কমেছে এবং ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নির্বাচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কংগ্রেস ইরান, গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়েল স্টার্নহেল বলেন, এটি একটি নতুন যুগের সূচনা। গাজা ও ইরান যুদ্ধের সম্মিলিত প্রভাব মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও তা দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভোটারদের আবার দলে ফেরানোর কয়েকটি উপায় তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পও এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেননি। ভোট গ্রহণের দিন মঙ্গলবার তিনি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি একমত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেন।

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রায় দুই দশক ধরে কয়েক দফায় ক্ষমতায় রয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থন পেতে তিনি জোর প্রচেষ্টা চালালেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হলে তা এড়াতে ইসরাইলের ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকে পড়া উচিত।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল কিংবা সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে নেতানিয়াহু এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত আমিত সেগাল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ইসরাইলের জন্য ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

আইজেনকট কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারবেন?

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী জোট গঠনের চেষ্টা করছেন গাদি আইজেনকট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন।

এক বিবৃতিতে সাবেক এই সামরিক প্রধান বলেন, তিনি উদারনৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে কাজ করতে চান।

আইজেনকটের জোটের বামপন্থী নেতা ইয়ার গোলানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের দ্বিদলীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, নেতানিয়াহু এই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও তোলেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের বিরোধিতা করাকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বারাক ওবামাও রয়েছেন, যিনি এখনো অনেক ডেমোক্র্যাটের কাছে জনপ্রিয়। প্রায় এক দশক আগে ইরান বিষয়ে ওবামার কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করতে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন।

ইয়েল স্টার্নহেলের মতে, নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাটদের বিরক্ত করেছেন এবং তাঁদের দূরে সরিয়ে দিতে সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন। তবে আইজেনকট শুধু নেতানিয়াহুর তুলনায় ভিন্ন ব্যক্তি হলেই নতুন কংগ্রেসের কাছ থেকে ইতিবাচক আচরণ পাবেন না। এর জন্য তাঁকে নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে।

স্টার্নহেল আরও বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো উগ্রপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আইজেনকট ইসরাইলের সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে পারেন।

তবে ইসরাইলি সমাজের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গাজা যুদ্ধের শুরুতে দেশটির জনগণের মধ্যে এ যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক সমর্থনও ছিল।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে মার্কিন সমালোচনা বাড়ছে

নতুন মার্কিন কংগ্রেসে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের উপস্থিতি ইসরাইলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে আব্দুল এল-সায়েদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে পরিচিত। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে তিনি গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ইসরাইল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে থাকা ইসরাইলি গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক কো-অপারেশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক পরিচালক এলি কোয়াজ বলেন, নেতানিয়াহু শুধু রিপাবলিকানদের ওপর নয়, ব্যক্তিগতভাবেও ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করেছিলেন।

তাঁর মতে, নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, সেই রাজনৈতিক সমর্থনেরও সীমা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের সংকট শুধু ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক গবেষক এহুদ এলিয়ামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াও ইসরাইলের নিজস্ব বড় অস্ত্রশিল্প রয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশটি সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে ইসরাইলকে তুলনামূলক সস্তা কামানের গোলা ও কম উন্নত বোমার ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

এহুদ এলিয়াম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বড় অংশ, এমনকি পুরো সহায়তা হারানোর মতো পরিস্থিতির সঙ্গেও ইসরাইলকে মানিয়ে নিতে হবে। তবে তা দেশটির জন্য কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া কিংবা কর বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত বিবেচনা করতে হতে পারে।

অন্যদিকে, এলি কোয়াজের মতে, আইজেনকট যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধাবস্থার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত চুক্তিকে গুরুত্ব দিতে চান।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন, গাজা ও ইরান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি নতুন নেতৃত্বের অধীনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা হবে—তা নির্ভর করবে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দুই দেশের ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।