
বৈষম্য, অবহেলা আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে রংপুরে একসঙ্গে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পথে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় তারা অংশ নেন। টানা তিন ঘণ্টার এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই পর্যায়ে পৌঁছানো তাদের জন্য গর্বের বিষয়।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভাগের ৯টি কেন্দ্রে মোট ১ হাজার ১৩২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৮ জনই তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী।
পরীক্ষার্থী মোছাম্মৎ আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, “এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। আমরা দীর্ঘদিন অবহেলার শিকার হয়েছি। এখন সুযোগ পেয়েছি—এটাই আমাদের বড় শক্তি। আমরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।”
অন্যান্য পরীক্ষার্থীরাও সরকারের সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ তাদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এবারের অংশগ্রহণ সেই ইতিবাচক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলভিত্তিক এসএসসি প্রোগ্রামে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালু করা হয়েছে। তাদের কোর্স ফি’র ৬০ শতাংশ মওকুফ করা হয়েছে, যা শিক্ষার সুযোগকে আরও সহজ ও প্রবেশযোগ্য করেছে।
পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. মাহেদুল আলম বলেন, “একসঙ্গে ২৮ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ সত্যিই ব্যতিক্রমী। আমরা তাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করেছি, যাতে তারা কোনো সংকোচ ছাড়াই পরীক্ষা দিতে পারে।”
রংপুরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক আবু হাফিজ মো. ফজলে নিজামি জানান, “তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হন, সেজন্য বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, “শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কেউ যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ কেবল একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সমাজে সমতা, মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সামাজিক অবস্থান শক্তিশালী হবে এবং তারা মূলধারার উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 























