ঢাকা ১১:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
বিপিএল বাতিলের ক্ষতি পোষাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সিডব্লিউএবি লিবিয়ার তাজুরা বন্দিশালা থেকে দেশে ফিরলেন আরও ১৭৪ বাংলাদেশি হরমুজ প্রণালিতে দুই সুপারট্যাংকারে হামলা, ৯২ ডলার ছাড়াল তেলের দাম গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পটিয়ার লবণশিল্প, কমেছে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও আয় আট বছর পর ওসমানী বিমানবন্দরে বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট সাবেক বিচারপতি-আইনজীবীসহ ৬৫০ জনের জামায়াতে যোগদানের দাবি পে-স্কেলের পর পণ্যের দাম না বাড়ানোর আহ্বান এফবিসিসিআইর রংপুরের চার খুন: জেলগেটে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শার্শায় দুই শিশুর মৃত্যু, বাবারও মরদেহ উদ্ধার মেসির বিদায়ে বেকহ্যামের আবেগঘন বার্তা, ‘তোমার দৃষ্টান্ত মনে থাকবে’

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পটিয়ার লবণশিল্প, কমেছে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও আয়

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০৯:৫৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১২৩৩ Time View

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে পটিয়ার ইন্দ্রপুলের লবণ কারখানাগুলোতে কমেছে উৎপাদন ও শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা।

চট্টগ্রামের পটিয়ার ইন্দ্রপুলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে লবণ কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে কারখানাগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়ও কমে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকেরা।

মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ইন্দ্রপুলের বিভিন্ন লবণ কারখানা ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন কার্যক্রম অনেকটাই কম। কোথাও সীমিত পরিসরে কাজ চললেও কোনো কোনো কারখানায় মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

শ্রমিকেরা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদনযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এতে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করতে হয়। যেহেতু অনেক শ্রমিক উৎপাদনভিত্তিক মজুরি পান, তাই কর্মঘণ্টা কমার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ও কমে যাচ্ছে।

ইন্দ্রপুলের লবণশ্রমিক সালাউদ্দিন বলেন, ‘কারখানা চললেই কাজ থাকে। এখন কাজের সময় কমে যাওয়ায় মজুরিও কমেছে। সংসারের খরচ চালাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।’

কমেছে উৎপাদন, বাড়ছে লোকসান

ইন্দ্রপুল এলাকায় প্রায় ৪০টি লবণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০টি চালু আছে। শিল্পমালিকদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এসব কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

মোস্তফা সল্ট, করিম সল্ট ও আনোয়ারা ট্রেডসহ বড় কয়েকটি কারখানা গ্যাসনির্ভর। মালিকদের দাবি, গত এক মাসে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। ফলে আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ২ হাজার টন লবণ উৎপাদন হতো, সেখানে এখন উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। এতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টন উৎপাদন কম হচ্ছে।

মোস্তফা সল্টের পরিচালক মুজিরুল হক সিদ্দিকী বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সংকটের সমাধান না হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তার মতে, এর প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকদের ওপর নয়; লবণচাষি, পরিবহন শ্রমিকসহ পুরো শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবিকায় পড়বে।

লবণ মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য ও ইসলামাবাদ সল্ট ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদ সামাদ হেলাল বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত এক মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অর্ডার বাতিলের পাশাপাশি সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে।

তিনি জানান, গ্যাস সংকটের বিষয়টি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (কেজিডিসিএল) লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। অক্টোবর থেকে পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে শিল্প টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যাংকঋণ পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

একে সুলতানপুরী সল্টের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ ফারুক বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন বারবার বন্ধ হয়ে যায়। তাই গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই ধরনের জ্বালানির সরবরাহই স্বাভাবিক করা জরুরি।

মোহাম্মদী সল্টের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে কাঁচা লবণ সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে।

আইয়ুব আলী সল্টের স্বত্বাধিকারী মোরশেদ বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

‘আগে আট ঘণ্টা, এখন পাঁচ ঘণ্টা কাজ’

ইন্দ্রপুল লবণ শ্রমিক সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, আগে শ্রমিকেরা দিনে প্রায় আট ঘণ্টা কাজের সুযোগ পেতেন। বর্তমানে অনেকের কর্মঘণ্টা কমে প্রায় পাঁচ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। উৎপাদনভিত্তিক মজুরি হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আয়ে।

ইসলামাবাদ সল্টের শ্রমিক বেলাল বলেন, ‘কখন কাজ হবে আর কখন কারখানা বন্ধ থাকবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।’

আরেক শ্রমিক বাবুল হক বলেন, ‘এভাবে সংকট চলতে থাকলে অনেক শ্রমিকের কাজ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।’

গ্যাস-বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ গ্যাস বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিভিন্ন গ্রাহকের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পটিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী আ স ম রেজাউন নবী বলেন, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদনের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোড ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, এর প্রভাব ইন্দ্রপুলের লবণ কারখানাগুলোতেও পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে পটিয়ার শিল্পাঞ্চলেও সংকট কমবে বলে আশা করেন তিনি।

৭৪ বছরের পুরোনো ইন্দ্রপুলের লবণশিল্প

পটিয়ার ইন্দ্রপুলে লবণশিল্পের ইতিহাস প্রায় ৭৪ বছরের। ১৯৫২ সালের দিকে চানখালী খালকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় লবণশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে নৌপথে কাঁচা লবণ এনে চানখালী খালের পাশে মজুত করা হতো। পরে সেই লবণ প্রক্রিয়াজাত ও পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারজাত শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে ইন্দ্রপুলে একের পর এক লবণ কারখানা গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম শহর ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগের সুবিধা এ শিল্পের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা থেকে কাঁচা লবণ এনে ইন্দ্রপুলে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। এ শিল্পকে ঘিরে লবণ পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুদামজাত, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণে যুক্ত রয়েছেন হাজারো মানুষ।

তাই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, ইন্দ্রপুলের লবণশিল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিএল বাতিলের ক্ষতি পোষাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সিডব্লিউএবি

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পটিয়ার লবণশিল্প, কমেছে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও আয়

প্রকাশের সময়ঃ ০৯:৫৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের পটিয়ার ইন্দ্রপুলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে লবণ কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে কারখানাগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়ও কমে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকেরা।

মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ইন্দ্রপুলের বিভিন্ন লবণ কারখানা ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন কার্যক্রম অনেকটাই কম। কোথাও সীমিত পরিসরে কাজ চললেও কোনো কোনো কারখানায় মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

শ্রমিকেরা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদনযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এতে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করতে হয়। যেহেতু অনেক শ্রমিক উৎপাদনভিত্তিক মজুরি পান, তাই কর্মঘণ্টা কমার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ও কমে যাচ্ছে।

ইন্দ্রপুলের লবণশ্রমিক সালাউদ্দিন বলেন, ‘কারখানা চললেই কাজ থাকে। এখন কাজের সময় কমে যাওয়ায় মজুরিও কমেছে। সংসারের খরচ চালাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।’

কমেছে উৎপাদন, বাড়ছে লোকসান

ইন্দ্রপুল এলাকায় প্রায় ৪০টি লবণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০টি চালু আছে। শিল্পমালিকদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এসব কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

মোস্তফা সল্ট, করিম সল্ট ও আনোয়ারা ট্রেডসহ বড় কয়েকটি কারখানা গ্যাসনির্ভর। মালিকদের দাবি, গত এক মাসে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। ফলে আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ২ হাজার টন লবণ উৎপাদন হতো, সেখানে এখন উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। এতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টন উৎপাদন কম হচ্ছে।

মোস্তফা সল্টের পরিচালক মুজিরুল হক সিদ্দিকী বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সংকটের সমাধান না হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তার মতে, এর প্রভাব শুধু কারখানার শ্রমিকদের ওপর নয়; লবণচাষি, পরিবহন শ্রমিকসহ পুরো শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবিকায় পড়বে।

লবণ মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য ও ইসলামাবাদ সল্ট ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদ সামাদ হেলাল বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত এক মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অর্ডার বাতিলের পাশাপাশি সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে।

তিনি জানান, গ্যাস সংকটের বিষয়টি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (কেজিডিসিএল) লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। অক্টোবর থেকে পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে শিল্প টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যাংকঋণ পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

একে সুলতানপুরী সল্টের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ ফারুক বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন বারবার বন্ধ হয়ে যায়। তাই গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই ধরনের জ্বালানির সরবরাহই স্বাভাবিক করা জরুরি।

মোহাম্মদী সল্টের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে কাঁচা লবণ সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে।

আইয়ুব আলী সল্টের স্বত্বাধিকারী মোরশেদ বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

‘আগে আট ঘণ্টা, এখন পাঁচ ঘণ্টা কাজ’

ইন্দ্রপুল লবণ শ্রমিক সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, আগে শ্রমিকেরা দিনে প্রায় আট ঘণ্টা কাজের সুযোগ পেতেন। বর্তমানে অনেকের কর্মঘণ্টা কমে প্রায় পাঁচ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। উৎপাদনভিত্তিক মজুরি হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আয়ে।

ইসলামাবাদ সল্টের শ্রমিক বেলাল বলেন, ‘কখন কাজ হবে আর কখন কারখানা বন্ধ থাকবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।’

আরেক শ্রমিক বাবুল হক বলেন, ‘এভাবে সংকট চলতে থাকলে অনেক শ্রমিকের কাজ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।’

গ্যাস-বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ গ্যাস বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিভিন্ন গ্রাহকের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পটিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী আ স ম রেজাউন নবী বলেন, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদনের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোড ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, এর প্রভাব ইন্দ্রপুলের লবণ কারখানাগুলোতেও পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে পটিয়ার শিল্পাঞ্চলেও সংকট কমবে বলে আশা করেন তিনি।

৭৪ বছরের পুরোনো ইন্দ্রপুলের লবণশিল্প

পটিয়ার ইন্দ্রপুলে লবণশিল্পের ইতিহাস প্রায় ৭৪ বছরের। ১৯৫২ সালের দিকে চানখালী খালকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় লবণশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে নৌপথে কাঁচা লবণ এনে চানখালী খালের পাশে মজুত করা হতো। পরে সেই লবণ প্রক্রিয়াজাত ও পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারজাত শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে ইন্দ্রপুলে একের পর এক লবণ কারখানা গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম শহর ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগের সুবিধা এ শিল্পের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা থেকে কাঁচা লবণ এনে ইন্দ্রপুলে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। এ শিল্পকে ঘিরে লবণ পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুদামজাত, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণে যুক্ত রয়েছেন হাজারো মানুষ।

তাই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, ইন্দ্রপুলের লবণশিল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।