
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এবার শুধু সড়ক কিংবা ড্রেনে ওষুধ ছিটিয়ে দায় সারতে চাইছে না প্রশাসন। এডিস মশার ‘আস্তানা’ খুঁজে বের করতে পৌর এলাকার বাড়ি বাড়ি যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংস, ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা—সবকিছু একসঙ্গে চালাতে গঠন করা হয়েছে ৮টি বিশেষ টিম।
বুধবার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ডেঙ্গু মশক নিধন বিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে টিমগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করবে। যেখানে জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্নতা কিংবা মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ পাওয়া যাবে, সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ফগিং ও লার্ভিসাইড প্রয়োগের মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
তবে শুধু অভিযান নয়—প্রথমে নাগরিকদের সচেতন করা হবে। এরপরও কেউ নির্দেশনা না মানলে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সভায় জানানো হয়।
ঘরের ভেতরেও এডিসের প্রজননস্থল!
সভায় জেলা প্রশাসক জানান, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধি দল কয়েকদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে। তাদের দেওয়া পরামর্শে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক বিষয়—এডিস মশার প্রজননস্থল এখন শুধু রাস্তা, ড্রেন কিংবা খোলা জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই; বাড়ির ভেতরেও তৈরি হচ্ছে মশার প্রজননস্থল।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে যতই মশক নিধনের ওষুধ ছিটানো হোক, ঘরের ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, ড্রাম, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা পরিত্যক্ত সামগ্রীতে পানি জমে থাকলে সেখান থেকেই আবার এডিসের বংশবিস্তার ঘটতে পারে।
জেলা প্রশাসক সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ কারণে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক জেলার সকল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও ডেঙ্গু মশক নিধনে বিশেষ টিম গঠন করার নির্দেশ দেন।
শহর পেরিয়ে গ্রামেও ডেঙ্গুর বিস্তার
সভায় ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান তুলে ধরেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন। তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নেই; গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটছে।
ফলে ডেঙ্গুকে শুধু পৌর এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। বসতবাড়ি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত স্থানে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দুটি ওয়ার্ডে একটি টিম, ২ নম্বর ওয়ার্ডে আলাদা টিম
পৌর এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে গঠিত ৮টি টিমকে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি দুটি ওয়ার্ডের জন্য একটি করে টিম এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য পৃথক একটি টিম কাজ করবে।
প্রতিটি টিমে থাকবেন একজন টিম লিডার, পৌরসভার কর্মচারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সাংবাদিক, স্কাউটস সদস্য এবং রেডক্রিসেন্টের সদস্যরা।
এ সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে প্রশাসনের অভিযানকে সরাসরি নাগরিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কোথায় পানি জমেছে, কোথায় এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন বাড়ি বা স্থাপনায় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে—এসব বিষয় মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টা ‘এডিসবিরোধী অভিযান’
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত টিমগুলো পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে মাঠে থাকবে।
এ সময় তারা সম্ভাব্য প্রজননস্থল খুঁজবে, প্রয়োজনীয় মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং বাসিন্দাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করবে।
একই সঙ্গে কোথাও এডিস মশার লার্ভা কিংবা প্রজননের অনুকূল পরিবেশ পাওয়া গেলে তা ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হবে।
মশা মারলেই শেষ নয়, ভাঙতে হবে এডিসের ‘প্রজনন কারখানা’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন নয়, মশার বংশবিস্তারের জায়গা ধ্বংস করা।
বাড়ির ছাদে পড়ে থাকা ভাঙা বালতি, ফুলের টব, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, পুরোনো টায়ার, বোতল কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে জমে থাকা সামান্য পানিও এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এ কারণে ‘পৌরসভা ওষুধ ছিটাবে, আর নাগরিকরা ঘরে বসে থাকবে’—এমন মানসিকতা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নাগরিকের বাড়ির ভেতরের একটি ছোট পানির পাত্রও আশপাশের মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি পানির ট্যাংক, ড্রাম ও অন্যান্য সংরক্ষণ পাত্র ঢেকে রাখা, ফুলের টব ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং পরিত্যক্ত সামগ্রী সরিয়ে ফেলা জরুরি।
নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত স্থানেও নজর
ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা ও অপরিচ্ছন্ন ঝোপঝাড়ও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে পারে।
তাই শুধু আবাসিক ভবন নয়, নির্মাণাধীন ভবন, খালি প্লট, ড্রেন, ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত স্থান এবং যেসব জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে—সবখানেই নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতা শুধু পৌরসভার দায়িত্ব নয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের ভূমিকার বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। একটি এলাকার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে শুধু পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাড়ির ভেতর ও আঙিনা পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া এবং আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
একটি বাড়ির আঙিনায় জমে থাকা পানি যেমন ওই বাড়ির বাসিন্দাদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, তেমনি আশপাশের কয়েকটি বাড়িতেও এডিস মশার বিস্তার ঘটাতে পারে।
তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর লড়াই শুরু হতে পারে নিজের ঘর, ছাদ ও আঙিনা থেকেই।
এলাকাভিত্তিক কমিটি, মসজিদে সচেতনতামূলক খুতবার উদ্যোগ
ডেঙ্গু প্রতিরোধকে শুধু সরকারি অভিযান না রেখে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করে এলাকাভিত্তিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে।
একই সঙ্গে মসজিদে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতামূলক খুতবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
কারণ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল মশার বিরুদ্ধে নয়; এটি একই সঙ্গে অপরিচ্ছন্নতা, অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধেও লড়াই।
সাংবাদিক, স্কাউটস ও রেডক্রিসেন্ট-মাঠে থাকবে জনসম্পৃক্ততার শক্তি
এবারের কর্মসূচিতে সাংবাদিক, স্কাউটস ও রেডক্রিসেন্ট সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর ফলে মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরির সুযোগ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
টিম সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলবেন, ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে জানাবেন এবং এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করতে সহযোগিতা করবেন।
একই সঙ্গে কোথায় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে কিংবা কোথায় বারবার পানি জমছে—সেসব স্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একদিনের অভিযান নয়, দরকার ধারাবাহিক নজরদারি
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করাই শেষ কথা নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পরও নিয়মিত নজরদারি না থাকলে নতুন করে সেখানে পানি জমতে পারে এবং এডিস মশা আবারও বংশবিস্তার করতে পারে।
তাই ৮টি টিমের কার্যক্রম কতটা নিয়মিত হচ্ছে, কোন এলাকায় কতটি প্রজননস্থল পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে কি না এবং একই স্থানে পুনরায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের অভিযান তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন এর সঙ্গে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যুক্ত হবে।
‘আমার বাড়ি পরিষ্কার’-এমন আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রেখেই দায়িত্ব শেষ মনে করা। এডিস মশা কোনো বাড়ির সীমানা মেনে চলে না। পাশের বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, খালি প্লট কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায় পানি জমে থাকলেও সেখান থেকে মশার বিস্তার ঘটতে পারে।
তাই নিজের বাড়ির পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণ করতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
প্রশাসনের আহ্বান—ডেঙ্গুমুক্ত জেলা গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে
সভায় জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রশাসনের ৮টি টিম মাঠে নামার মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন করে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এখন এই অভিযান কতটা নিয়মিত, কার্যকর ও জনসম্পৃক্ত হয়—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ফগিংয়ে মশা কমানো যায়, কিন্তু এডিসের বংশবিস্তার বন্ধ করতে হলে ধ্বংস করতে হবে তার প্রজননস্থল। আর সেই প্রজননস্থলের বড় একটি অংশ যদি মানুষের ঘর, ছাদ, আঙিনা কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে থাকে, তাহলে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইও শুরু করতে হবে সেখান থেকেই।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন, শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম, গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান, নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা দাস, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মতিন, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাহিদা আখতার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন অর রশিদ, নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আহসান হাবীব, জেলা রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিদ্দিক আসাদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 

























