ঢাকা ০৫:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ তাহসিফ হত্যা মামলা: দীপকে ফের ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ শেখ হাসিনা বেঁচে থাকা পর্যন্ত অস্থিতিশীলতার চেষ্টা চলবে: তথ্য উপদেষ্টা ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ: বিজ্ঞানমন্ত্রী মজুরি কমিশন গঠন হয়েছে, এখন আন্দোলনের সুযোগ নেই: প্রতিমন্ত্রী টুকু মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে অরাজকতার চেষ্টা, রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ডিএনসিসি প্রশাসকের শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি, সতর্ক বিএনপি নেতাকর্মীরাও মিরপুর-১১-তে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, যান চলাচল স্বাভাবিক; আটক ৪ এইচএসসিতে শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে, শাস্তির মুখে শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানপ্রধান গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১
পূজার ছুটি হলো চিরবিদায়!

বাবার হাত ধরে বেড়াতে গিয়ে ফিরল না ছোট্ট তাসফিয়া

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০২:৩৭:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২৭১ Time View

বাবার সাথে পণ্য কিনতে রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন জাজিরার

আনন্দের সফর মুহূর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুযাত্রায়, স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী দুই পরিবারের আকাশ; জীবিকার তাগিদে পণ্য কিনতে যাওয়া পাঁচ ব্যবসায়ী ও বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে বের হওয়া আট বছরের শিশুটির আর বাড়ি ফেরা হলো না

পূজার ছুটি মানেই ছিল একটু স্বস্তি, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আর চেনা জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে আনন্দের মুহূর্ত খুঁজে নেওয়া। কারও পরিকল্পনা ছিল পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার, কারও লক্ষ্য ছিল জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসার পণ্য কিনে বাড়ি ফেরা। কিন্তু একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সব হিসাব পাল্টে দিল। আনন্দের বদলে নেমে এলো শোক, স্বপ্নের বদলে রয়ে গেল নিথর দেহ, আর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের জীবনে নেমে এলো দীর্ঘশ্বাসের এক অন্তহীন অধ্যায়।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ছোট্ট তাসফিয়ার। মাত্র আট বছর বয়স। বাবার হাত ধরে পূজার ছুটিতে বেড়াতে যাচ্ছিল সে। হয়তো পথের দুপাশের দৃশ্য দেখছিল, হয়তো রাজশাহীতে পৌঁছে আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ করার কথা ভাবছিল। কিন্তু সেই যাত্রাই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে, তা কি কেউ জানত? বাবার সঙ্গে বেরিয়ে বাবার সঙ্গেই চিরবিদায়ের পথে চলে গেল ছোট্ট শিশুটি। আর যে বাড়িতে পৌঁছে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল, সেখানে এখন অপেক্ষা করছে কান্না, শূন্যতা আর বুকফাটা আহাজারি।

অন্যদিকে, জীবিকার তাগিদে রাজশাহীর তাহেরপুরে পণ্য কিনতে যাচ্ছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পাঁচ ব্যবসায়ী। ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও ভুসিমাল কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার কথা ছিল তাঁদের। ব্যবসার পুঁজি কাজে লাগিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, সংসারের খরচ চালানো এবং স্বজনদের নিয়ে ভালো থাকার স্বপ্ন ছিল তাঁদেরও। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নাটোরের বড়াইগ্রামে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় থেমে গেল তাঁদের জীবনযাত্রা।

গতকাল সোমবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও কয়েকজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী, পটুয়াখালীর ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলাম এবং তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া। শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা বেগম ও বড় ছেলে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে আর ফেরা হলো না পাঁচ ব্যবসায়ীর

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় এখন শোকের ছায়া। যাঁরা প্রতিদিনের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, যাঁদের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের ছিল পরিচিত সম্পর্ক, তাঁদের কয়েকজনই আর ফিরবেন না। যে মানুষগুলো পণ্য কিনে বাড়ি ফেরার পর হিসাব মেলাতেন, দোকানের মালামাল সাজাতেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন—তাঁদের জন্য এখন অপেক্ষা করে আছে নীরব ঘর আর অসংখ্য স্মৃতি।

দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন—জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর (৩৮), ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে সালাল মোল্যা (৪০), ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (২৮), কাজিরহাট এলাকার ভুসিমাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে শাহিন বেপারী (৩৭)। একই দুর্ঘটনায় কাজিরহাট এলাকার আলমগীর মাদবর (৫৫) গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করে আসছিলেন। তাঁদের কারও ব্যবসা ছিল ভুসিমাল নিয়ে, কেউ হলুদের ব্যবসা করতেন, আবার কেউ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

নিহত জুয়েল মাদবর ভুসিমালের পাশাপাশি রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ছিলেন ভুসিমাল ব্যবসায়ী। শাহিন বেপারী হলুদের ব্যবসা করতেন। সালাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদারও বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁরা রাজশাহীর তাহেরপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সেখান থেকে কৃষিপণ্য ও ভুসিমাল কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা ছিল। এই সফর তাঁদের কাছে ছিল দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ—পণ্য কেনা, ব্যবসার হিসাব মেলানো, সংসারের প্রয়োজন মেটানো। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সেই স্বাভাবিক জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।

এখন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে মানুষটি সংসারের হাল ধরতেন, যাঁর উপার্জনে চলত পরিবারের চাকা, তিনি না থাকলে আগামী দিনগুলো কীভাবে চলবে? যাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় স্বজনেরা ছিলেন, তাঁদের পরিবর্তে বাড়িতে পৌঁছাবে শোকের খবর। পরিবারের শিশুদের কাছে বাবার অনুপস্থিতি, স্ত্রীদের কাছে জীবনসঙ্গী হারানোর বেদনা আর মা-বাবার কাছে সন্তানের মৃত্যু—এই শোকের কোনো সহজ ভাষা নেই।

বাবার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে চিরবিদায় ছোট্ট তাসফিয়ার

এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের শহিদুল ইসলাম ও তাঁর ছোট মেয়ে তাসফিয়ার মৃত্যু।

শহিদুল ইসলাম পেশায় ব্যাংকার। তিনি মাগুরা জেলায় ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাগঞ্জ গ্রামে। তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া সুবিদখালী নূরানি মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজশাহীতে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন শহিদুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা বেগম। শহিদুল ইসলামের ভায়রা এবং রুবিনা বেগমের ছোট বোনের বাড়ি রাজশাহীতে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেখানে গিয়ে ছুটির সময়টা আনন্দে কাটানোর কথা ছিল।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা পটুয়াখালী থেকে মাগুরা হয়ে রাজশাহীর উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরিবারের সদস্যদের জন্য মাগুরায় অপেক্ষা করছিলেন শহিদুল ইসলামের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেন। তাঁরও অপেক্ষা ছিল প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার, একসঙ্গে সময় কাটানোর।

কিন্তু পথের সেই যাত্রা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি। নাটোরের বড়াইগ্রামে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান শহিদুল ইসলাম ও তাঁর ছোট মেয়ে তাসফিয়া। গুরুতর আহত হন তাঁর স্ত্রী রুবিনা বেগম ও বড় ছেলে।

যে শিশুটির জন্য পূজার ছুটি ছিল আনন্দের, যে ছুটিতে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে নতুন পরিবেশে সময় কাটানোর কথা ছিল, সেই ছুটিই তার জীবনের শেষ ছুটি হয়ে রইল। যে বাবা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলেন, সেই বাবার সঙ্গে একই দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে গেল তার ছোট্ট পৃথিবী।

তাসফিয়ার সহপাঠীরা হয়তো আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরবে, মাদ্রাসার পাঠ চলবে নিয়মমতো। কিন্তু ছোট্ট তাসফিয়া আর ফিরবে না। তার বই-খাতা, পড়ার জায়গা, পরিচিত মুখগুলো—সবই থেকে যাবে, শুধু সে থাকবে না। একটি পরিবারের কাছে এই অনুপস্থিতি কোনো সাময়িক বিচ্ছেদ নয়; এটি এমন এক শূন্যতা, যা সময়ের সঙ্গে হয়তো কিছুটা সহনীয় হবে, কিন্তু কখনো পুরোপুরি পূরণ হবে না।

“আনন্দ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল”

নিহত শহিদুল ইসলামের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেনের কথায় ফুটে উঠেছে স্বজন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। তিনি জানান, পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজশাহীতে ভায়রার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল শহিদুলের। এ কারণে তিনি মাগুরায় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

ফারুক হোসেনের ভাষ্য, পরিবারের সবাই মিলে পূজার ছুটিতে আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে। তাঁর ভাই শহিদুল ইসলাম ও ভাতিজি তাসফিয়া ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও ছেলে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

একটি পরিবারের আনন্দময় সফর যে এভাবে মৃত্যু ও অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ হবে, তা কল্পনাও করেননি স্বজনেরা। একদিকে ভাই ও ভাতিজিকে হারানোর শোক, অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভাবি ও ভাতিজার জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা—ফারুক হোসেনের পরিবারের ওপর যেন একসঙ্গে নেমে এসেছে অসহনীয় কয়েকটি আঘাত।

শোকের এই মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা সামলাতে হচ্ছে না; আহত স্বজনদের চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে।

একই দুর্ঘটনায় নিভে গেল ভিন্ন ভিন্ন জীবনের স্বপ্ন

দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের জীবনযাত্রা ছিল ভিন্ন। কেউ ছিলেন ব্যবসায়ী, কেউ ব্যাংক কর্মকর্তা, কেউ আবার ছিল মাত্র আট বছরের এক শিশু। তাঁদের কারও সামনে ছিল সংসারের দায়িত্ব, কারও সামনে পেশাগত ভবিষ্যৎ, আর কারও সামনে ছিল শৈশবের দীর্ঘ পথ।

কিন্তু সড়কের একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাঁদের সবাইকে একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।

জাজিরার ব্যবসায়ীরা বেরিয়েছিলেন পণ্য কিনে ব্যবসা চালানোর জন্য। শহিদুল ইসলাম যাচ্ছিলেন পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে। তাসফিয়া হয়তো বুঝতেই পারেনি, একটি দীর্ঘ যাত্রা কখনো কখনো জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের সবার উদ্দেশ্য আলাদা হলেও প্রত্যেকের গন্তব্য ছিল জীবনের পরিচিত পরিসরে ফিরে যাওয়া।

কেউ ফিরতে চেয়েছিলেন দোকানে, কেউ সংসারে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ ভাগাভাগি করতে। অথচ এখন তাঁদের পরিচিত মানুষদের কাছে রয়ে গেছে কেবল স্মৃতি, শোক আর অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্ন।

এই মৃত্যুগুলো শুধু কয়েকটি পরিবারের ক্ষতি নয়; প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সংসার, একটি সামাজিক সম্পর্ক, কিছু অসমাপ্ত দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অনেক পরিকল্পনা। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ হারালে তাঁর পরিবারের আর্থিক ও মানসিক নিরাপত্তা কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তা সহজেই অনুমেয়। আর একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্নকেও থামিয়ে দেয়।

সড়কে মৃত্যুর মিছিল, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে জনজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়কে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করা হয়, তদন্ত ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা জোরদার হচ্ছে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নাটোরের বড়াইগ্রামের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও নতুন করে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। একটি দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানির খবর কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে ১৪টি জীবন, অসংখ্য স্বজন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের গল্প। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, চালক বা ব্যবস্থাকে দায়ী করা সমীচীন নয়। কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, কোন পরিস্থিতিতে এত প্রাণহানি হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের বিশ্রাম ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের নিয়ম মানা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার কারণ অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্বজনদের কান্না, আর ফিরে আসবে না প্রিয় মুখগুলো

যাঁরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় প্রিয়জনদের বলে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে আবার দেখা হবে, তাঁদের কেউ আর ফিরবেন না। তাঁদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর আর শোনা যাবে না, দরজায় কড়া নাড়বে না প্রিয় মানুষটি।

জাজিরার ব্যবসায়ীদের পরিবারে এখন শোকের ভার। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে শহিদুল ইসলাম ও তাসফিয়ার মৃত্যুর খবর আরও গভীর বেদনা ছড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের বাড়িতে এখন উৎসবের আনন্দের বদলে শোকের মাতম। যে পরিবার পূজার ছুটিতে একসঙ্গে আনন্দ করার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পরিবারের সদস্যদের এখন হাসপাতালের বিছানায় আহত স্বজনের পাশে থাকতে হচ্ছে, আর অন্যদিকে সামলাতে হচ্ছে দুই প্রিয়জনকে হারানোর অসহনীয় কষ্ট।

পূজার ছুটি শেষ হয়ে যাবে, কর্মব্যস্ততা আবার শুরু হবে, মানুষ ফিরবে যার যার কাজে। কিন্তু যেসব পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের কাছে জীবন আর আগের মতো থাকবে না। উৎসবের দিনগুলোতে হয়তো অন্যদের আনন্দ দেখে তাঁদের মনে পড়বে সেই অসমাপ্ত সফরের কথা। মনে পড়বে, এই সময়টায় তো একসঙ্গে থাকার কথা ছিল, গল্প করার কথা ছিল, বাড়ি ফিরে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল।

ছোট্ট তাসফিয়ার জীবনের গল্পটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। কারণ, তার সামনে ছিল বেড়ে ওঠার অসংখ্য দিন, নতুন কিছু শেখার সুযোগ, পরিবারকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি তৈরির সম্ভাবনা। অথচ সে আর বড় হবে না, স্কুলের নতুন ক্লাসে উঠবে না, বাবার হাত ধরে আর কোথাও বেড়াতে যাবে না। তার ছোট্ট পৃথিবী থেমে গেছে, আর সেই থেমে যাওয়া পৃথিবীর শোক বয়ে বেড়াতে হবে তার পরিবারকে।

একইভাবে, জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ীর পরিবারও হারিয়েছে তাদের আপনজনদের। তাঁদের কর্মব্যস্ত দিন, পরিচিত বাজার, ব্যবসার হিসাব আর সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো এখন স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।

একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারে কতগুলো জীবন, কতগুলো পরিবারের স্বাভাবিকতা এবং কতগুলো ভবিষ্যৎ—নাটোরের বড়াইগ্রামের এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।

পূজার ছুটি তাঁদের জন্য আর আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকল না; হয়ে রইল চিরবিচ্ছেদের ক্ষত। কেউ ফিরলেন না পণ্য নিয়ে, কেউ ফিরলেন না আত্মীয়ের বাড়িতে, আর ছোট্ট তাসফিয়াও বাবার হাত ধরে বেড়াতে গিয়ে আর মায়ের কোলে ফিরে এলো না।

এখন স্বজনদের একটাই চাওয়া—আহতরা সুস্থ হয়ে উঠুন, নিহতদের পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা পাক এবং এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

মৃত্যুর এই মিছিল যেন আর কোনো পরিবারের উৎসবকে শোকে পরিণত না করে—সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সবার।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ

পূজার ছুটি হলো চিরবিদায়!

বাবার হাত ধরে বেড়াতে গিয়ে ফিরল না ছোট্ট তাসফিয়া

প্রকাশের সময়ঃ ০২:৩৭:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

আনন্দের সফর মুহূর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুযাত্রায়, স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী দুই পরিবারের আকাশ; জীবিকার তাগিদে পণ্য কিনতে যাওয়া পাঁচ ব্যবসায়ী ও বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে বের হওয়া আট বছরের শিশুটির আর বাড়ি ফেরা হলো না

পূজার ছুটি মানেই ছিল একটু স্বস্তি, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আর চেনা জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে আনন্দের মুহূর্ত খুঁজে নেওয়া। কারও পরিকল্পনা ছিল পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার, কারও লক্ষ্য ছিল জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসার পণ্য কিনে বাড়ি ফেরা। কিন্তু একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সব হিসাব পাল্টে দিল। আনন্দের বদলে নেমে এলো শোক, স্বপ্নের বদলে রয়ে গেল নিথর দেহ, আর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের জীবনে নেমে এলো দীর্ঘশ্বাসের এক অন্তহীন অধ্যায়।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ছোট্ট তাসফিয়ার। মাত্র আট বছর বয়স। বাবার হাত ধরে পূজার ছুটিতে বেড়াতে যাচ্ছিল সে। হয়তো পথের দুপাশের দৃশ্য দেখছিল, হয়তো রাজশাহীতে পৌঁছে আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ করার কথা ভাবছিল। কিন্তু সেই যাত্রাই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে, তা কি কেউ জানত? বাবার সঙ্গে বেরিয়ে বাবার সঙ্গেই চিরবিদায়ের পথে চলে গেল ছোট্ট শিশুটি। আর যে বাড়িতে পৌঁছে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল, সেখানে এখন অপেক্ষা করছে কান্না, শূন্যতা আর বুকফাটা আহাজারি।

অন্যদিকে, জীবিকার তাগিদে রাজশাহীর তাহেরপুরে পণ্য কিনতে যাচ্ছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পাঁচ ব্যবসায়ী। ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও ভুসিমাল কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার কথা ছিল তাঁদের। ব্যবসার পুঁজি কাজে লাগিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, সংসারের খরচ চালানো এবং স্বজনদের নিয়ে ভালো থাকার স্বপ্ন ছিল তাঁদেরও। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নাটোরের বড়াইগ্রামে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় থেমে গেল তাঁদের জীবনযাত্রা।

গতকাল সোমবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও কয়েকজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী, পটুয়াখালীর ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলাম এবং তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া। শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা বেগম ও বড় ছেলে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে আর ফেরা হলো না পাঁচ ব্যবসায়ীর

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় এখন শোকের ছায়া। যাঁরা প্রতিদিনের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, যাঁদের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের ছিল পরিচিত সম্পর্ক, তাঁদের কয়েকজনই আর ফিরবেন না। যে মানুষগুলো পণ্য কিনে বাড়ি ফেরার পর হিসাব মেলাতেন, দোকানের মালামাল সাজাতেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন—তাঁদের জন্য এখন অপেক্ষা করে আছে নীরব ঘর আর অসংখ্য স্মৃতি।

দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন—জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর (৩৮), ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে সালাল মোল্যা (৪০), ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (২৮), কাজিরহাট এলাকার ভুসিমাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে শাহিন বেপারী (৩৭)। একই দুর্ঘটনায় কাজিরহাট এলাকার আলমগীর মাদবর (৫৫) গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করে আসছিলেন। তাঁদের কারও ব্যবসা ছিল ভুসিমাল নিয়ে, কেউ হলুদের ব্যবসা করতেন, আবার কেউ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

নিহত জুয়েল মাদবর ভুসিমালের পাশাপাশি রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ছিলেন ভুসিমাল ব্যবসায়ী। শাহিন বেপারী হলুদের ব্যবসা করতেন। সালাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদারও বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁরা রাজশাহীর তাহেরপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সেখান থেকে কৃষিপণ্য ও ভুসিমাল কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা ছিল। এই সফর তাঁদের কাছে ছিল দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ—পণ্য কেনা, ব্যবসার হিসাব মেলানো, সংসারের প্রয়োজন মেটানো। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সেই স্বাভাবিক জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।

এখন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে মানুষটি সংসারের হাল ধরতেন, যাঁর উপার্জনে চলত পরিবারের চাকা, তিনি না থাকলে আগামী দিনগুলো কীভাবে চলবে? যাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় স্বজনেরা ছিলেন, তাঁদের পরিবর্তে বাড়িতে পৌঁছাবে শোকের খবর। পরিবারের শিশুদের কাছে বাবার অনুপস্থিতি, স্ত্রীদের কাছে জীবনসঙ্গী হারানোর বেদনা আর মা-বাবার কাছে সন্তানের মৃত্যু—এই শোকের কোনো সহজ ভাষা নেই।

বাবার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে চিরবিদায় ছোট্ট তাসফিয়ার

এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের শহিদুল ইসলাম ও তাঁর ছোট মেয়ে তাসফিয়ার মৃত্যু।

শহিদুল ইসলাম পেশায় ব্যাংকার। তিনি মাগুরা জেলায় ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাগঞ্জ গ্রামে। তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া সুবিদখালী নূরানি মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজশাহীতে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন শহিদুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা বেগম। শহিদুল ইসলামের ভায়রা এবং রুবিনা বেগমের ছোট বোনের বাড়ি রাজশাহীতে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেখানে গিয়ে ছুটির সময়টা আনন্দে কাটানোর কথা ছিল।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা পটুয়াখালী থেকে মাগুরা হয়ে রাজশাহীর উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরিবারের সদস্যদের জন্য মাগুরায় অপেক্ষা করছিলেন শহিদুল ইসলামের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেন। তাঁরও অপেক্ষা ছিল প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার, একসঙ্গে সময় কাটানোর।

কিন্তু পথের সেই যাত্রা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি। নাটোরের বড়াইগ্রামে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান শহিদুল ইসলাম ও তাঁর ছোট মেয়ে তাসফিয়া। গুরুতর আহত হন তাঁর স্ত্রী রুবিনা বেগম ও বড় ছেলে।

যে শিশুটির জন্য পূজার ছুটি ছিল আনন্দের, যে ছুটিতে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে নতুন পরিবেশে সময় কাটানোর কথা ছিল, সেই ছুটিই তার জীবনের শেষ ছুটি হয়ে রইল। যে বাবা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলেন, সেই বাবার সঙ্গে একই দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে গেল তার ছোট্ট পৃথিবী।

তাসফিয়ার সহপাঠীরা হয়তো আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরবে, মাদ্রাসার পাঠ চলবে নিয়মমতো। কিন্তু ছোট্ট তাসফিয়া আর ফিরবে না। তার বই-খাতা, পড়ার জায়গা, পরিচিত মুখগুলো—সবই থেকে যাবে, শুধু সে থাকবে না। একটি পরিবারের কাছে এই অনুপস্থিতি কোনো সাময়িক বিচ্ছেদ নয়; এটি এমন এক শূন্যতা, যা সময়ের সঙ্গে হয়তো কিছুটা সহনীয় হবে, কিন্তু কখনো পুরোপুরি পূরণ হবে না।

“আনন্দ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল”

নিহত শহিদুল ইসলামের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেনের কথায় ফুটে উঠেছে স্বজন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। তিনি জানান, পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজশাহীতে ভায়রার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল শহিদুলের। এ কারণে তিনি মাগুরায় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

ফারুক হোসেনের ভাষ্য, পরিবারের সবাই মিলে পূজার ছুটিতে আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে। তাঁর ভাই শহিদুল ইসলাম ও ভাতিজি তাসফিয়া ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও ছেলে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

একটি পরিবারের আনন্দময় সফর যে এভাবে মৃত্যু ও অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ হবে, তা কল্পনাও করেননি স্বজনেরা। একদিকে ভাই ও ভাতিজিকে হারানোর শোক, অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভাবি ও ভাতিজার জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা—ফারুক হোসেনের পরিবারের ওপর যেন একসঙ্গে নেমে এসেছে অসহনীয় কয়েকটি আঘাত।

শোকের এই মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা সামলাতে হচ্ছে না; আহত স্বজনদের চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে।

একই দুর্ঘটনায় নিভে গেল ভিন্ন ভিন্ন জীবনের স্বপ্ন

দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের জীবনযাত্রা ছিল ভিন্ন। কেউ ছিলেন ব্যবসায়ী, কেউ ব্যাংক কর্মকর্তা, কেউ আবার ছিল মাত্র আট বছরের এক শিশু। তাঁদের কারও সামনে ছিল সংসারের দায়িত্ব, কারও সামনে পেশাগত ভবিষ্যৎ, আর কারও সামনে ছিল শৈশবের দীর্ঘ পথ।

কিন্তু সড়কের একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা তাঁদের সবাইকে একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।

জাজিরার ব্যবসায়ীরা বেরিয়েছিলেন পণ্য কিনে ব্যবসা চালানোর জন্য। শহিদুল ইসলাম যাচ্ছিলেন পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে। তাসফিয়া হয়তো বুঝতেই পারেনি, একটি দীর্ঘ যাত্রা কখনো কখনো জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের সবার উদ্দেশ্য আলাদা হলেও প্রত্যেকের গন্তব্য ছিল জীবনের পরিচিত পরিসরে ফিরে যাওয়া।

কেউ ফিরতে চেয়েছিলেন দোকানে, কেউ সংসারে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আনন্দ ভাগাভাগি করতে। অথচ এখন তাঁদের পরিচিত মানুষদের কাছে রয়ে গেছে কেবল স্মৃতি, শোক আর অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্ন।

এই মৃত্যুগুলো শুধু কয়েকটি পরিবারের ক্ষতি নয়; প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সংসার, একটি সামাজিক সম্পর্ক, কিছু অসমাপ্ত দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অনেক পরিকল্পনা। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ হারালে তাঁর পরিবারের আর্থিক ও মানসিক নিরাপত্তা কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তা সহজেই অনুমেয়। আর একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্নকেও থামিয়ে দেয়।

সড়কে মৃত্যুর মিছিল, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে জনজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়কে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করা হয়, তদন্ত ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা জোরদার হচ্ছে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নাটোরের বড়াইগ্রামের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও নতুন করে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। একটি দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানির খবর কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে ১৪টি জীবন, অসংখ্য স্বজন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের গল্প। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, চালক বা ব্যবস্থাকে দায়ী করা সমীচীন নয়। কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, কোন পরিস্থিতিতে এত প্রাণহানি হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের বিশ্রাম ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের নিয়ম মানা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার কারণ অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্বজনদের কান্না, আর ফিরে আসবে না প্রিয় মুখগুলো

যাঁরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় প্রিয়জনদের বলে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে আবার দেখা হবে, তাঁদের কেউ আর ফিরবেন না। তাঁদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর আর শোনা যাবে না, দরজায় কড়া নাড়বে না প্রিয় মানুষটি।

জাজিরার ব্যবসায়ীদের পরিবারে এখন শোকের ভার। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে শহিদুল ইসলাম ও তাসফিয়ার মৃত্যুর খবর আরও গভীর বেদনা ছড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের বাড়িতে এখন উৎসবের আনন্দের বদলে শোকের মাতম। যে পরিবার পূজার ছুটিতে একসঙ্গে আনন্দ করার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পরিবারের সদস্যদের এখন হাসপাতালের বিছানায় আহত স্বজনের পাশে থাকতে হচ্ছে, আর অন্যদিকে সামলাতে হচ্ছে দুই প্রিয়জনকে হারানোর অসহনীয় কষ্ট।

পূজার ছুটি শেষ হয়ে যাবে, কর্মব্যস্ততা আবার শুরু হবে, মানুষ ফিরবে যার যার কাজে। কিন্তু যেসব পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের কাছে জীবন আর আগের মতো থাকবে না। উৎসবের দিনগুলোতে হয়তো অন্যদের আনন্দ দেখে তাঁদের মনে পড়বে সেই অসমাপ্ত সফরের কথা। মনে পড়বে, এই সময়টায় তো একসঙ্গে থাকার কথা ছিল, গল্প করার কথা ছিল, বাড়ি ফিরে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল।

ছোট্ট তাসফিয়ার জীবনের গল্পটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। কারণ, তার সামনে ছিল বেড়ে ওঠার অসংখ্য দিন, নতুন কিছু শেখার সুযোগ, পরিবারকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি তৈরির সম্ভাবনা। অথচ সে আর বড় হবে না, স্কুলের নতুন ক্লাসে উঠবে না, বাবার হাত ধরে আর কোথাও বেড়াতে যাবে না। তার ছোট্ট পৃথিবী থেমে গেছে, আর সেই থেমে যাওয়া পৃথিবীর শোক বয়ে বেড়াতে হবে তার পরিবারকে।

একইভাবে, জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ীর পরিবারও হারিয়েছে তাদের আপনজনদের। তাঁদের কর্মব্যস্ত দিন, পরিচিত বাজার, ব্যবসার হিসাব আর সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো এখন স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।

একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারে কতগুলো জীবন, কতগুলো পরিবারের স্বাভাবিকতা এবং কতগুলো ভবিষ্যৎ—নাটোরের বড়াইগ্রামের এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।

পূজার ছুটি তাঁদের জন্য আর আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকল না; হয়ে রইল চিরবিচ্ছেদের ক্ষত। কেউ ফিরলেন না পণ্য নিয়ে, কেউ ফিরলেন না আত্মীয়ের বাড়িতে, আর ছোট্ট তাসফিয়াও বাবার হাত ধরে বেড়াতে গিয়ে আর মায়ের কোলে ফিরে এলো না।

এখন স্বজনদের একটাই চাওয়া—আহতরা সুস্থ হয়ে উঠুন, নিহতদের পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা পাক এবং এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

মৃত্যুর এই মিছিল যেন আর কোনো পরিবারের উৎসবকে শোকে পরিণত না করে—সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সবার।