
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এবার বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ২২ হাজার ১১৪ জন শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
ফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইংরেজি, উচ্চতর গণিত, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), হিসাববিজ্ঞান ও বাংলাসহ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে। বিভাগভিত্তিক ফলে সবচেয়ে পিছিয়ে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদের পাসের হারও ছাত্রীদের তুলনায় কম। পাশাপাশি তিন পার্বত্য জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাসের হার বেশ নিচে।
শনিবার প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯৭। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমেছে। এ ছাড়া ১৫৫টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরের বছর ২০০৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশে। করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৮০ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৭০ দশমিক ৩২ শতাংশ। সেই তুলনায় এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এবার এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ২২ হাজার ১১৪ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কলেজভিত্তিক ফলে ১৫৫টি প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। গত বছর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। এ ছাড়া ১০টি কলেজে পাসের হার ১০ শতাংশের নিচে, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ছয়টি। ২৭টি কলেজে পাসের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, ৮২টি কলেজে পাসের হার ৫০ শতাংশের বেশি, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৮৬টি।
পাঁচ বিষয়ে নাজুক ফল
এবার চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনে ২৮৩টি কলেজের ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। ১১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
বিষয়ভিত্তিক ফলে অধিকাংশ বিষয়ে পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি হলেও পাঁচটি বিষয়ে ফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে ইংরেজিতে পাসের হার সবচেয়ে কম, ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ ছাড়া উচ্চতর গণিতে ৭০ দশমিক ২৩, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে ৭৩ দশমিক ৩৬, হিসাববিজ্ঞানে ৮১ দশমিক ৪৬ এবং বাংলায় ৮৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন।
মানবিক বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে কম
বিভাগভিত্তিক ফলে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সর্বোচ্চ ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
তিন পার্বত্য জেলায় ফল বিপর্যয়
জেলাভিত্তিক ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যদিকে, খাগড়াছড়িতে পাসের হার মাত্র ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা বোর্ডের জেলাগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। রাঙামাটিতে পাসের হার ৩৩ দশমিক ২৪, বান্দরবানে ৪১ দশমিক ৪২ এবং কক্সবাজারে ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
ছাত্রীদের চেয়ে পিছিয়ে ছাত্ররা
পাসের হার ও জিপিএ-৫—উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৪ হাজার ৬৭১ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ২৯ হাজার ৮২২ জন। অন্যদিকে, ৪১ হাজার ৬৬৪ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ২০ হাজার ৩৪৪ জন।
জিপিএ-৫ কমেছে অর্ধেকের বেশি
এবার চট্টগ্রাম বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৯২৯ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯৭ এবং ২০২৪ সালে ছিল ১০ হাজার ২৬৯। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি কমেছে।
এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ১ হাজার ৫৯৬ জন এবং ছাত্র ১ হাজার ৩৩৩ জন।
তিন কলেজের কেউ পাস করেননি
এবার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মেরন সান কলেজ, সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এর মধ্যে মেরন সান কলেজ থেকে দুজন, সৃজনী ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পাঁচজন এবং বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে দুজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছর ছিল আটটি। এবার তা কমে ছয়টিতে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে অকৃতকার্যের হার বেশি। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও খারাপ ফল করেছেন। ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের ফল খারাপ হয়েছে। মহানগরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক ভালো করলেও তিন পার্বত্য জেলার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে রয়েছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। এসব কারণে সামগ্রিক ফলে প্রভাব পড়েছে।
বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবদুল মান্নান বলেন, বর্তমানে অনেক ছাত্র পড়ালেখায় অমনোযোগী। পড়াশোনার চেয়ে তারা মোবাইল ফোন ও আড্ডায় বেশি সময় ব্যয় করছে। এবারের ফলেও এর প্রভাব দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ছাত্রীদের পাশাপাশি ছাত্ররাও ভালো ফল করলে বোর্ডের সামগ্রিক ফল আরও ভালো হতো উল্লেখ করে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অধিকার ডেস্কঃ 




















