ঢাকা ০৭:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি সাইনবোর্ডে ‘ডাক্তার’, আসলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট! চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে ‘অবরুদ্ধ করে’ পিটুনি, আহত ৭; সাংবাদিক-পুলিশও লাঞ্ছিত “মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে আর রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন নয়”- তথ্যমন্ত্রী শিবগঞ্জে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আগুনের খেলায় মেতে উঠল শিশুরা মাগুরায় শুরু দুই দিনব্যাপী “হাজরাপুরী লিচু মেলা-২০২৬” দেবিদ্বারে ছেলের পিটুনিতে বাবার মৃত্যু পাটগ্রাম সীমান্তে সাবেক কূটনীতিক আটক, জব্দ ৭ পাসপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উদ্বোধনে গৌরনদীতে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু পারিবারিক কলহের জেরে নাটোরে বৃদ্ধ স্বামী খুন, স্ত্রী আটক

টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে পানির নিচে ঠাকুরগাঁওয়ের ফসলি মাঠ, দিশেহারা কৃষকরা

টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে কুমড়া ও ঝিঙের ক্ষেত। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন এলাকায়।সংগৃহীত ছবি

টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে ঠাকুরগাঁও জেলায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবজি, ধান, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠজুড়ে জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নিচু জমির প্রায় সব সবজিক্ষেত পানির নিচে ডুবে আছে। ভুট্টা গাছগুলো হেলে পড়েছে, কোথাও কোথাও ভেঙেও গেছে। পাকা ধানের জমিতে পানি জমে থাকায় কৃষকরা ধান কাটতে পারছেন না। কুমড়া চাষিরা বাধ্য হয়ে ছোট অবস্থাতেই ফসল তুলে নিচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে পানি নামতে না পারায় সবজি গাছের গোড়ায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকছে। এতে শিকড় পচে গিয়ে গাছ ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। বেগুন, মরিচ, টমেটো, লাউ ও শসার চারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে, আবার অনেক ক্ষেতেই পুরো গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কৃষক রমজান আলী বলেন, “অনেক কষ্ট করে সবজি চাষ করেছি। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানি না নামলে কিছুই বাঁচানো যাবে না।”

অন্যদিকে আকচা এলাকার ভুট্টা চাষি জাহিদ মিলু বলেন, “ভুট্টা গাছ বড় হলে পানি সহ্য করতে পারে না। এখন জমিতে হাঁটুপানি জমে আছে। গাছ হেলে পড়ছে, ভেঙেও যাচ্ছে। এতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছি।”

শুধু সবজি ও ভুট্টা নয়, ধান ক্ষেতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানি জমে থাকায় ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে এবং ফলন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করায় ক্ষতির ফলে তাদের মধ্যে ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সদর উপজেলার রহিমানপুর এলাকার কৃষক সোহেল রানা বলেন, “ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। ফসল নষ্ট হলে কীভাবে ঋণ শোধ করব জানি না। এখন সরকারের সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছি।”

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে শুধু ঝড়ের কারণে ভুট্টা ৩৫৮ হেক্টর, মরিচ ৯৪ হেক্টর, শাকসবজি ২১ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ১ হেক্টর, আম-লিচু-পেঁপে মিলে ৩৮২ হেক্টর এবং কলা ৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলে মাটিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা গাছের শিকড় নষ্ট করে। পাশাপাশি ছত্রাকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ফসল পচে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এদিকে অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে নালা কেটে পানি সরানোর চেষ্টা করলেও টানা বৃষ্টির কারণে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আলমগীর কবির বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ফসল রক্ষা কার্যক্রম জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। নাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি

টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে পানির নিচে ঠাকুরগাঁওয়ের ফসলি মাঠ, দিশেহারা কৃষকরা

প্রকাশের সময়ঃ ০১:১৫:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে ঠাকুরগাঁও জেলায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবজি, ধান, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠজুড়ে জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নিচু জমির প্রায় সব সবজিক্ষেত পানির নিচে ডুবে আছে। ভুট্টা গাছগুলো হেলে পড়েছে, কোথাও কোথাও ভেঙেও গেছে। পাকা ধানের জমিতে পানি জমে থাকায় কৃষকরা ধান কাটতে পারছেন না। কুমড়া চাষিরা বাধ্য হয়ে ছোট অবস্থাতেই ফসল তুলে নিচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে পানি নামতে না পারায় সবজি গাছের গোড়ায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকছে। এতে শিকড় পচে গিয়ে গাছ ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। বেগুন, মরিচ, টমেটো, লাউ ও শসার চারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে, আবার অনেক ক্ষেতেই পুরো গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কৃষক রমজান আলী বলেন, “অনেক কষ্ট করে সবজি চাষ করেছি। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানি না নামলে কিছুই বাঁচানো যাবে না।”

অন্যদিকে আকচা এলাকার ভুট্টা চাষি জাহিদ মিলু বলেন, “ভুট্টা গাছ বড় হলে পানি সহ্য করতে পারে না। এখন জমিতে হাঁটুপানি জমে আছে। গাছ হেলে পড়ছে, ভেঙেও যাচ্ছে। এতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছি।”

শুধু সবজি ও ভুট্টা নয়, ধান ক্ষেতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানি জমে থাকায় ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে এবং ফলন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করায় ক্ষতির ফলে তাদের মধ্যে ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সদর উপজেলার রহিমানপুর এলাকার কৃষক সোহেল রানা বলেন, “ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। ফসল নষ্ট হলে কীভাবে ঋণ শোধ করব জানি না। এখন সরকারের সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছি।”

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে শুধু ঝড়ের কারণে ভুট্টা ৩৫৮ হেক্টর, মরিচ ৯৪ হেক্টর, শাকসবজি ২১ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ১ হেক্টর, আম-লিচু-পেঁপে মিলে ৩৮২ হেক্টর এবং কলা ৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলে মাটিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা গাছের শিকড় নষ্ট করে। পাশাপাশি ছত্রাকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ফসল পচে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এদিকে অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে নালা কেটে পানি সরানোর চেষ্টা করলেও টানা বৃষ্টির কারণে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আলমগীর কবির বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ফসল রক্ষা কার্যক্রম জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। নাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।