ঢাকা ০১:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি সাইনবোর্ডে ‘ডাক্তার’, আসলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট! চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে ‘অবরুদ্ধ করে’ পিটুনি, আহত ৭; সাংবাদিক-পুলিশও লাঞ্ছিত “মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে আর রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন নয়”- তথ্যমন্ত্রী শিবগঞ্জে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আগুনের খেলায় মেতে উঠল শিশুরা মাগুরায় শুরু দুই দিনব্যাপী “হাজরাপুরী লিচু মেলা-২০২৬” দেবিদ্বারে ছেলের পিটুনিতে বাবার মৃত্যু পাটগ্রাম সীমান্তে সাবেক কূটনীতিক আটক, জব্দ ৭ পাসপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উদ্বোধনে গৌরনদীতে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু পারিবারিক কলহের জেরে নাটোরে বৃদ্ধ স্বামী খুন, স্ত্রী আটক
আইসিইউর অভাবে নিভে গেল রাফসান

“একটা আইসিইউ থাকলে হয়তো আমার বুকটা আজ খালি হতো না…”

হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি ছিল রাফসান আয়ার। এই ছবি এখন শুধু স্মৃতি।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বুকফাটা কান্নায় কথাগুলো বলছিলেন চা দোকানি পারভেজ মোশাররফ। তার কোলজুড়ে থাকা ১৫ মাসের একমাত্র সন্তান রাফসান আয়ার আর নেই। দেড় মাসের নিরন্তর যুদ্ধ, হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো, শেষ সম্বল বিক্রি করেও সন্তানকে বাঁচানো গেল না। বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মৃত্যুর কাছে হার মানে শিশুটি।

রাফসানের মৃত্যু যেন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভাঙা নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার নির্মম অসহায়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুর ঢল, অন্যদিকে নেই প্রয়োজনীয় শিশু আইসিইউ সুবিধা। চিকিৎসকরা বলছেন, সংকটাপন্ন শিশুদের বাঁচাতে আইসিইউ না থাকায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা পারভেজ মোশাররফ পেশায় একজন ক্ষুদ্র চা দোকানি। স্ত্রী রুপা আক্তার ও একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই ছিল তার ছোট্ট সুখের সংসার। কিন্তু গত মাসের মাঝামাঝি রাফসানের জ্বর ও নিউমোনিয়া ধরা পড়ার পর থেকেই শুরু হয় দুঃস্বপ্নের দিন।

পরিবারের দাবি, ২৬ এপ্রিল হাম প্রতিরোধের টিকা দেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ৫ মে মাওনা আল হেরা হাসপাতাল থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চলছিল জীবন-মৃত্যুর লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরবিদায় নেয় রাফসান।

শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালের করিডোরজুড়ে ভেসে আসে স্বজনদের কান্না আর ক্ষোভ। পারভেজ মোশাররফ বারবার বলছিলেন, “টাকা যা ছিল সব শেষ করেছি। শুধু একটা আইসিইউর অভাবে আমার ছেলেটা চলে গেল। বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ থাকবে না—এটা কীভাবে হয়?”

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে। অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, “এ ধরনের জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউ সাপোর্ট অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলে হয়তো অনেক শিশুকেই বাঁচানো সম্ভব হতো।”

সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাজহারুল আমীন জানান, অধিকাংশ মৃত শিশু গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসে এবং তাদের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে শিশু আইসিইউ স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৪ শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১০২ শিশু। গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট এক হাজার ৩১৭ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক হাজার ১৮৩ জন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, সেখানে এখনো কেন পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা গড়ে ওঠেনি? আর কত রাফসানের নিথর দেহ কাঁধে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বিলাপ করবেন অসহায় বাবা-মায়েরা?

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি

আইসিইউর অভাবে নিভে গেল রাফসান

“একটা আইসিইউ থাকলে হয়তো আমার বুকটা আজ খালি হতো না…”

প্রকাশের সময়ঃ ০২:১৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বুকফাটা কান্নায় কথাগুলো বলছিলেন চা দোকানি পারভেজ মোশাররফ। তার কোলজুড়ে থাকা ১৫ মাসের একমাত্র সন্তান রাফসান আয়ার আর নেই। দেড় মাসের নিরন্তর যুদ্ধ, হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো, শেষ সম্বল বিক্রি করেও সন্তানকে বাঁচানো গেল না। বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মৃত্যুর কাছে হার মানে শিশুটি।

রাফসানের মৃত্যু যেন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভাঙা নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার নির্মম অসহায়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুর ঢল, অন্যদিকে নেই প্রয়োজনীয় শিশু আইসিইউ সুবিধা। চিকিৎসকরা বলছেন, সংকটাপন্ন শিশুদের বাঁচাতে আইসিইউ না থাকায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা পারভেজ মোশাররফ পেশায় একজন ক্ষুদ্র চা দোকানি। স্ত্রী রুপা আক্তার ও একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই ছিল তার ছোট্ট সুখের সংসার। কিন্তু গত মাসের মাঝামাঝি রাফসানের জ্বর ও নিউমোনিয়া ধরা পড়ার পর থেকেই শুরু হয় দুঃস্বপ্নের দিন।

পরিবারের দাবি, ২৬ এপ্রিল হাম প্রতিরোধের টিকা দেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ৫ মে মাওনা আল হেরা হাসপাতাল থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চলছিল জীবন-মৃত্যুর লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরবিদায় নেয় রাফসান।

শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালের করিডোরজুড়ে ভেসে আসে স্বজনদের কান্না আর ক্ষোভ। পারভেজ মোশাররফ বারবার বলছিলেন, “টাকা যা ছিল সব শেষ করেছি। শুধু একটা আইসিইউর অভাবে আমার ছেলেটা চলে গেল। বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ থাকবে না—এটা কীভাবে হয়?”

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে। অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, “এ ধরনের জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউ সাপোর্ট অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলে হয়তো অনেক শিশুকেই বাঁচানো সম্ভব হতো।”

সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাজহারুল আমীন জানান, অধিকাংশ মৃত শিশু গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসে এবং তাদের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে শিশু আইসিইউ স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৪ শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১০২ শিশু। গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট এক হাজার ৩১৭ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক হাজার ১৮৩ জন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, সেখানে এখনো কেন পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা গড়ে ওঠেনি? আর কত রাফসানের নিথর দেহ কাঁধে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বিলাপ করবেন অসহায় বাবা-মায়েরা?