
রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত হজরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে ওরস অনুষ্ঠান চলাকালে হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। হামলায় স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও দলটির পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে। অন্যদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের বক্তব্যেও দেখা দিয়েছে ভিন্নতা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে মাজারে ওরস উপলক্ষে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও জিয়ারতে শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাজার এলাকায় ভিড়ও বাড়তে থাকে। এমন সময় লাঠিসোটা হাতে একদল ব্যক্তি মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে উপস্থিত লোকজনের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে।
হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হন। আতঙ্কে অনেকে মাজার এলাকা ছেড়ে চলে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অর্ধশতাধিক লোক লাঠি হাতে মাজারে ঢুকে যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই মারধর করছেন। অনেকের মুখে মাস্কও ছিল।
বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুস সবুর, যিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন, সাংবাদিকদের বলেন, “ওরস চলছিল স্বাভাবিকভাবেই। হঠাৎ একদল লোক এসে হামলা শুরু করে। তারা লাঠিসোটা দিয়ে মানুষকে মারতে থাকে। তখন বাইরে পুলিশের গাড়ি থাকলেও কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়নি।”
ঘটনার পর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক সরকার জানান, রাত ১টার দিকে একদল ব্যক্তি মাজারে গিয়ে হামলা চালায়। তিনি বলেন, “তারা জামায়াত-শিবিরের লোক বলে জানতে পেরেছি। তবে পুলিশ সেখানে কোনো অভিযান চালায়নি।”
অন্যদিকে দারুস সালাম অঞ্চলের সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমদাদ হোসেন বলেন, মাজার এলাকায় প্রতি বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান, গান-বাজনা ও ভিড় থাকে। সেখানে মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে।
তার ভাষ্য, “একটি দল মূল মাজারের কাছে গিয়ে মাদক সেবন করছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এতে জিয়ারতে আসা লোকজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তারা ওই ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালায়।”
তিনি আরও বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের কিছু কর্মী থাকতে পারেন, এমন তথ্য ভিডিও দেখে পাওয়া গেছে। তবে হামলাটি সংগঠিতভাবে তাদের নেতৃত্বে হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত নয়।
ঘটনার পর জামায়াতের নেতারা হামলায় দলীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করেছেন। ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতের এমপি মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) দাবি করেন, তিনি বিষয়টি জানার পর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাজারের সামনে মাদক বিক্রির অভিযোগে পুলিশ অভিযান চালায় এবং সেখানে স্থানীয় কিছু মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
তবে এ বিষয়ে পুলিশের উপকমিশনার মোস্তাক সরকার বলেন, “তার সঙ্গে বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার আমার কোনো কথা হয়নি।”
এদিকে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার এক বিবৃতিতে বলেন, “মাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচালনা করেছে। জামায়াতের কোনো নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
ঘটনার পর শুক্রবার পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। দারুস সালাম অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ইমদাদ হোসেন বলেন, “এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শাহ আলী মাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক সেবন ও গভীর রাত পর্যন্ত বিশৃঙ্খলার অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা মাদকবিরোধী নামে সেখানে গিয়ে অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছেন।
গত সপ্তাহেও স্থানীয় এক বিএনপি নেতা অনুসারীদের নিয়ে মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে পুলিশও মাঝে মধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে থাকে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী ১৭ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৯৭টি মাজার, দরগাহ ও খানকাহে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিকভাবে ১৩৪টি হামলার তথ্য পাওয়া গেলেও যাচাই-বাছাই শেষে ৯৭টির সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে কুমিল্লায় ১৭টি, নরসিংদীতে ১০টি এবং ঢাকায় ৯টি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত এবং প্রায় ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শাহ আলী মাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই উদ্বেগজনক প্রবণতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 

























