
জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, যতদিন আল্লাহ জীবন ও চলার শক্তি দেবেন, ততদিন জাতির প্রয়োজনে মাঠে থাকবেন।
সোমবার (১০ আগস্ট) গাইবান্ধার সাঘাটায় শহীদ শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী ও জামায়াত কর্মী সালাউদ্দিন আহমেদের কবর জিয়ারত এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বোনারপাড়ার কাজী আজহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে ডা. শফিকুর রহমান দুই ব্যক্তির কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের বাবা-মা ও স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাদের জন্য দোয়া করেন।
জনসমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, দুই শহীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য স্থানীয় মানুষের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে দেশের জনগণ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে আল্লাহ যেন তাকে কবুল করেন—এমন দোয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, যারা মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেন, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহর পথে জীবনদানকারীদের মৃত বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
‘আবার জুলুমের পথে ফেরা যাবে না’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময়ের জুলুম-নির্যাতনের অভিজ্ঞতার পর দেশকে আর সেই পথে ফেরানো যাবে না। সরকার গঠনের পরও সাধারণ মানুষ যদি ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের মাধ্যমে বঞ্চনার শিকার হন, তাহলে পরিবর্তনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জনগণের করের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই। বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রতি বৈষম্য করা হলে সেটিও জনগণের সঙ্গে অন্যায় হবে। ভোটের অধিকারে হস্তক্ষেপকে গণতন্ত্র বলা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনের সুযোগ পেলে উত্তরবঙ্গকে কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানিয়েছিল। সরকার গঠনের সুযোগ না পেলেও সংসদের ভেতরে এ দাবি তুলে ধরা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
চাঁদাবাজি-দখলদারিত্ব বন্ধের আহ্বান
দুই নিহত তরুণকে এলাকার শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, তারা অন্যায়ভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখোমুখি হতে না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষমতার অপব্যবহার, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজের কোনো ক্ষেত্রেই দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি থাকা উচিত নয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্যায় ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কাউকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়, যাতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি পুরো দেশের সম্পদ—তাই নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
‘ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারকে প্রশ্রয় নয়’
বিগত সময়ে নির্যাতন, হত্যা, গুম ও মামলার শিকার মানুষের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, এসব সমস্যা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাষায়, এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্যা।
বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছে দাবি করে তিনি বলেন, দেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের মানুষ রাজপথে নেমেছিল। প্রয়োজন হলে জনগণের অধিকার রক্ষায় আবারও রাজপথে নামতে তারা প্রস্তুত। জাতির প্রয়োজনে একবার নয়, শতবারও মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা
ডা. শফিকুর রহমান এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে শিশু, নারী, যুবক ও প্রবীণসহ সব শ্রেণির মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন। ধর্ম, বর্ণ ও ভাষাগত পরিচয় নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে দলীয় প্রভাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগে অর্থের লেনদেন, প্রতিষ্ঠান দখল এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা দুর্নীতি বন্ধ করতে চাই, দখলদারিত্ব বন্ধ করতে চাই, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই। আমরা একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।”
গণভোটের রায়কে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করে অতীতে কেউ টিকে থাকতে পারেনি। প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের পথ সুগম করার আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধী দল হিসেবে সরকার সঠিক পথে থাকলে সহযোগিতা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তবে অতীতের স্বৈরাচারী সরকারের পথ অনুসরণ করলে তার ফল ভালো হবে না।
বিদেশি আধিপত্য না মানার ঘোষণা
বাংলাদেশের ওপর কোনো বিদেশি শক্তির আধিপত্য বা হস্তক্ষেপ মেনে না নেওয়ার কথা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়। একই সঙ্গে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তিনি।
দ্রুত বিচার দাবি
জনসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আবদুল হালিম দুই শহীদ হত্যার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় ছয়জনকে আসামি করে মামলা হলেও দুজন এখনও গ্রেপ্তার হননি। চিহ্নিত আসামি পলাশকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি। তা না হলে প্রশাসনকে দায় নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
আইনের শাসনে জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তিনি প্রশাসনের প্রতি জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না করার আহ্বান জানান।
সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে আইন প্রয়োগে বৈষম্য হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। শহীদদের পরিবারের পাশে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বানও জানান তিনি।
জনসমাবেশে বক্তারা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বৈষম্য, অন্যায়, অবিচার, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জনগণের ভোটাধিকার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওয়ারেছের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, বগুড়া জেলা আমির আব্দুল হক, গাইবান্ধা জেলা আমির আব্দুল করিম এমপি, মাওলানা নজরুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক মাজেদুর রহমান এমপি, জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি ইউসুফ আল কারযাভী, সেক্রেটারি ফাহিম মন্ডলসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশ যৌথভাবে পরিচালনা করেন গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি সৈয়দ রোকনুজ্জামান ও সহকারী সেক্রেটারি ফয়সাল কবির রানা।
অধিকার ডেস্কঃ 






















