ঢাকা ০৮:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
যুক্তরাজ্যে কুকুরের হামলায় এক ব্যক্তির মৃত্যু, মালিক গ্রেপ্তার দুই জেলায় আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, বাড়তে পারে বৃষ্টির প্রবণতা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের জয় বিশ্বের কাছে বড় বার্তা- তামিম ইকবাল উত্তাল সাগরে মাঝপথে জ্বালানি শেষ, অচল স্পিডবোটে আতঙ্কে ৮ যাত্রী কাপ্তাই লেকের অবৈধ দখলদারদের তালিকা দাখিলের নির্দেশ-হাইকোর্টের শিবগঞ্জে শিকারির জাল থেকে টিয়াপাখি- ইউএনওর হাতে অবমুক্ত দুই-তিন বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসবে-প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বাগাতিপাড়ায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা বাগাতিপাড়ায় বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন, কেক কাটা ‘গত ১৭ বছরে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে’-আইনমন্ত্রী

গ্যাসের চাপ কমে রূপগঞ্জে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে লোকসান

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০৪:৪৬:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ১২৫৭ Time View

গ্যাসের স্বল্পচাপে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, দিনের বড় একটি সময় প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে।

উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় উদ্যোক্তাদের লোকসান বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পকারখানা পরিচালনা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে গ্যাস সংকটের কারণে রূপগঞ্জের কোনো নির্দিষ্ট কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং লোকসান বহন করেও প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের অন্তত ২২টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে।

গ্যাসনির্ভর মেশিন ও ক্যাপটিভ জেনারেটর প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। এতে অবশ্য উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ অনেক কম। এর প্রভাবে প্রতি পাউন্ড সুতায় প্রায় ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই। কিন্তু পিক আওয়ারে চাপ কমে প্রায় ১ থেকে দেড় পিএসআইয়ে নেমে আসে। কখনো কখনো লাইনে গ্যাসও পাওয়া যায় না। এতে দৈনিক ২৬ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ডে নেমেছে।

রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানে

জার আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে স্বাভাবিকভাবে জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কারখানা চালু রাখতে সিএনজি স্টেশন থেকে বোতলে গ্যাস এনে পাইপের মাধ্যমে জেনারেটরে সরবরাহ করতে হচ্ছে। এরপরও মাঝেমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বরপা এলাকার একটি নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় জেনারেটর চালাতে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এর পরও কারখানাটির উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।

সিএনজি স্টেশনেও প্রভাব

শিল্পকারখানার পাশাপাশি গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রূপগঞ্জের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উপজেলার চারটি ফিলিং স্টেশনেই স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।

কোনো কোনো দিন গভীর রাতে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়। দিনের বাকি সময় স্টেশনগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে স্টেশন মালিকদের আয় কমার পাশাপাশি গ্যাস নিতে আসা চালকদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক চালককে অন্য এলাকায় গিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

রংধনু ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দীর্ঘ সময় স্টেশন বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে মালিকপক্ষ লোকসান বহন করছেন বলে জানান তিনি।

রূপগঞ্জের অন্য তিনটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনেও প্রায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আয় কমলেও কর্মীদের চাকরি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা। তবে সংকট দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।

শ্রমিকদের কাজ কমলেও বেতন দিতে হচ্ছে

নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক পর্যাপ্ত কাজ না পেলেও তাদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে লোকসান চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।

শাহরিয়ার টেক্সটাইলের মালিক তারিকুল ইসলাম শাকিল ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কারখানার চার ভাগের এক ভাগ চালু রেখে বাকি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে সমস্যা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুরো কারখানা চালু করা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চললে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

মশিউর স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের মালিক মশিউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গ্যাসের অভাবে তাদের জেনারেটর প্রায় সারাদিন বন্ধ থাকছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার শ্রমিকের কাউকেই এখন পর্যন্ত চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। কিন্তু দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কাজ না থাকলেও তাদের বেতন দিতে হচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা নিয়ে মালিকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এম জেড স্পিনিংয়ের এক জেনারেটর প্রকৌশলী জানান, গ্যাসের অভাবে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। শ্রমিকদের কাজ কমলেও মালিকপক্ষ তাদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘদিন এভাবে চলা সম্ভব কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এ-ওয়ান পোলার লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহেদ হোসাইন বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব শ্রমিকদের আয়েও পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সময়ের কাজ কমেছে বা বন্ধ রয়েছে। এতে শ্রমিকদের বাড়তি আয়ও কমে গেছে।

বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, উদ্বেগ রপ্তানি নিয়েও

উদ্যোক্তাদের বড় সমস্যা হলো, উৎপাদন কমলেও অধিকাংশ স্থায়ী ব্যয় কমছে না। শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে।

ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে শিল্পকারখানার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

গ্যাস সংকটের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব তৈরি পোশাকের পুরো সরবরাহব্যবস্থায় পড়তে পারে।

বিটিএমএর সাবেক সহসভাপতি মো. সালেউদ জামান খান বলেন, রূপগঞ্জ দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পাঞ্চল। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দ্রুত সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িকভাবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা গেলেও দীর্ঘ সময় এভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে। এর প্রভাব রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাইনের সংস্কারকাজ চলায় সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কমেছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তারা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত লোকসান বহন করেও শ্রমিক-কর্মচারীদের ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। তবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় চাপসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাজ্যে কুকুরের হামলায় এক ব্যক্তির মৃত্যু, মালিক গ্রেপ্তার

গ্যাসের চাপ কমে রূপগঞ্জে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে লোকসান

প্রকাশের সময়ঃ ০৪:৪৬:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, দিনের বড় একটি সময় প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে।

উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় উদ্যোক্তাদের লোকসান বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পকারখানা পরিচালনা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে গ্যাস সংকটের কারণে রূপগঞ্জের কোনো নির্দিষ্ট কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং লোকসান বহন করেও প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের অন্তত ২২টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে।

গ্যাসনির্ভর মেশিন ও ক্যাপটিভ জেনারেটর প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। এতে অবশ্য উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ অনেক কম। এর প্রভাবে প্রতি পাউন্ড সুতায় প্রায় ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই। কিন্তু পিক আওয়ারে চাপ কমে প্রায় ১ থেকে দেড় পিএসআইয়ে নেমে আসে। কখনো কখনো লাইনে গ্যাসও পাওয়া যায় না। এতে দৈনিক ২৬ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ডে নেমেছে।

রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানে

জার আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে স্বাভাবিকভাবে জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কারখানা চালু রাখতে সিএনজি স্টেশন থেকে বোতলে গ্যাস এনে পাইপের মাধ্যমে জেনারেটরে সরবরাহ করতে হচ্ছে। এরপরও মাঝেমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বরপা এলাকার একটি নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় জেনারেটর চালাতে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এর পরও কারখানাটির উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।

সিএনজি স্টেশনেও প্রভাব

শিল্পকারখানার পাশাপাশি গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রূপগঞ্জের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উপজেলার চারটি ফিলিং স্টেশনেই স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।

কোনো কোনো দিন গভীর রাতে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়। দিনের বাকি সময় স্টেশনগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে স্টেশন মালিকদের আয় কমার পাশাপাশি গ্যাস নিতে আসা চালকদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক চালককে অন্য এলাকায় গিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

রংধনু ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দীর্ঘ সময় স্টেশন বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে মালিকপক্ষ লোকসান বহন করছেন বলে জানান তিনি।

রূপগঞ্জের অন্য তিনটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনেও প্রায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আয় কমলেও কর্মীদের চাকরি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা। তবে সংকট দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।

শ্রমিকদের কাজ কমলেও বেতন দিতে হচ্ছে

নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক পর্যাপ্ত কাজ না পেলেও তাদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে লোকসান চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।

শাহরিয়ার টেক্সটাইলের মালিক তারিকুল ইসলাম শাকিল ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কারখানার চার ভাগের এক ভাগ চালু রেখে বাকি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে সমস্যা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুরো কারখানা চালু করা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চললে কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

মশিউর স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের মালিক মশিউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গ্যাসের অভাবে তাদের জেনারেটর প্রায় সারাদিন বন্ধ থাকছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার শ্রমিকের কাউকেই এখন পর্যন্ত চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। কিন্তু দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কাজ না থাকলেও তাদের বেতন দিতে হচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা নিয়ে মালিকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এম জেড স্পিনিংয়ের এক জেনারেটর প্রকৌশলী জানান, গ্যাসের অভাবে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। শ্রমিকদের কাজ কমলেও মালিকপক্ষ তাদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘদিন এভাবে চলা সম্ভব কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এ-ওয়ান পোলার লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহেদ হোসাইন বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব শ্রমিকদের আয়েও পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সময়ের কাজ কমেছে বা বন্ধ রয়েছে। এতে শ্রমিকদের বাড়তি আয়ও কমে গেছে।

বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, উদ্বেগ রপ্তানি নিয়েও

উদ্যোক্তাদের বড় সমস্যা হলো, উৎপাদন কমলেও অধিকাংশ স্থায়ী ব্যয় কমছে না। শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে।

ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে শিল্পকারখানার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

গ্যাস সংকটের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব তৈরি পোশাকের পুরো সরবরাহব্যবস্থায় পড়তে পারে।

বিটিএমএর সাবেক সহসভাপতি মো. সালেউদ জামান খান বলেন, রূপগঞ্জ দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পাঞ্চল। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দ্রুত সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িকভাবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা গেলেও দীর্ঘ সময় এভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে। এর প্রভাব রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাইনের সংস্কারকাজ চলায় সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কমেছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তারা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত লোকসান বহন করেও শ্রমিক-কর্মচারীদের ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। তবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় চাপসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।