ঢাকা ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]

অবশেষে পাতিসারসের দেখা

কানাইঘাটের বড় হাওরের শুকিয়ে যাওয়া বিলে তিনটি পাতিসারস।

বছরখানেক আগে বিরল এক পরিযায়ী পাখির সন্ধানে ‘বার্ডিং বিডি টিম’-এর সঙ্গে সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে গিয়েছিলাম। স্থানীয় পাখি সংরক্ষণকর্মী শামীম খান আমাদের হাওরের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে নিয়ে যান। অসংখ্য বিল, জলচর পাখির আনাগোনা, হাঁসের ঝাঁক, আর গরু–মহিষের চরাই—সব মিলিয়ে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য।

তবে সেদিন ভাগ্য সহায় ছিল না। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, পরে নেমে আসে ঝুম বৃষ্টি। আমরা কাছের জেলেদের ডেরায় আশ্রয় নিয়ে ক্যামেরা রক্ষা করি। বৃষ্টি থামার পরও সারাদিন চষে বেড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত পাখি দুটির দেখা মেলেনি। প্রায় ১৪ কিলোমিটার হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাতের বাসে ঢাকায় ফিরেছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় আর তাদের দেখা যায়নি।

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি সামাজিক মাধ্যমে শামীম খানের পোস্টে তিনটি সারসের ছবি চোখে পড়ে। ধারণা করা হয়, আগের জোড়াটি এবার একটি ছানাসহ ফিরেছে। ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিক যাওয়া সম্ভব হয়নি। অবশেষে ২২ জানুয়ারি ছয়জনের একটি দল নিয়ে রওনা হই। পথে যানজটের কারণে সিলেটে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। দুপুরের দিকে হাওরের এক বাথানে শামীম খানের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি দূর থেকে বাইনোকুলারে পাখিগুলোর অবস্থান দেখান।

প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে বড় ঘাসঝোপের আড়ালে বসে পর্যবেক্ষণ শুরু করি। প্রায় আধঘণ্টা ধরে থেমে থেমে ছবি তোলা হয়। কিছু সময় পর পাখিগুলো উড়ে গেলে উড্ডয়নের ছবিও ধারণ করা সম্ভব হয়।

এই বিরল পাখির নাম পাতিসারস, ইংরেজিতে কমন বা ইউরেশিয়ান ক্রেন (Grus grus)। গ্রুইডি গোত্রের এ পাখি উত্তর ইউরোপ ও সাইবেরিয়ার আবাসিক; শীতে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিযান করে। বাংলাদেশে এটি অনিয়মিত ও তথ্যস্বল্প পরিযায়ী হিসেবে পরিচিত। উনিশ শতকে ঢাকা অঞ্চলে দেখা গেলেও পরে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত ছিল। ২০১৫ সালে ভোলায় পুনরায় দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী, মানিকগঞ্জ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট অঞ্চলে উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।

সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরের ওপর ছানাসহ উড়ন্ত পাতিসারস।

প্রাপ্তবয়স্ক পাতিসারসের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০–১৩০ সেন্টিমিটার, ওজন ৩–৬ কেজি। দেহ ও গলা লম্বা; সামগ্রিক পালক ধূসর। মুখমণ্ডল ও গলা কালো, মাথার উপরের অংশে লালচে ত্বক স্পষ্ট। চোখের পেছন থেকে সাদা দাগ ঘাড় বেয়ে পিঠ পর্যন্ত নেমে গেছে। চোখ লালচে, আর চঞ্চু ও পা ধূসরাভ। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারায় তেমন পার্থক্য না থাকলেও পুরুষ তুলনামূলক বড়।

এরা সাধারণত দিবাচর ও সতর্ক স্বভাবের। ছোট বা মাঝারি ঝাঁকে বিচরণ করে। ভোর ও গোধূলিতে খাদ্য অনুসন্ধানে সক্রিয় থাকে। জলাভূমিতে হেঁটে বা নরম কাদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে জলজ উদ্ভিদের কন্দ, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন খাদ্য সংগ্রহ করে; পাশাপাশি শস্য, বীজ ও ক্ষুদ্র প্রাণীও খায়। উড্ডয়নের আগে কিছুটা দৌড়ে গতি নেয়।

মে থেকে জুলাই তাদের প্রজননকাল। এ সময় সমন্বিত দৌড় ও নৃত্যভঙ্গি দেখা যায়। জলাশয়ের কাছে ডালপালা ও ঘাস দিয়ে বড় বাসা তৈরি করে, যা বছর বছর সংস্কার করে ব্যবহার করতে পারে। সাধারণত ২–৪টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই তা দেওয়া ও ছানা প্রতিপালনে অংশ নেয়। প্রায় এক মাসে ডিম ফুটে ছানা বের হয়; ৯ সপ্তাহের মধ্যে উড়তে শেখে, তবে পূর্ণ প্রজননক্ষমতা অর্জন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। আয়ুষ্কাল ১৩ বছরের বেশি।

— আ ন ম আমিনুর রহমান
পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ
অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

জনপ্রিয় সংবাদ

অবশেষে পাতিসারসের দেখা

প্রকাশের সময়ঃ ০২:১৮:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বছরখানেক আগে বিরল এক পরিযায়ী পাখির সন্ধানে ‘বার্ডিং বিডি টিম’-এর সঙ্গে সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে গিয়েছিলাম। স্থানীয় পাখি সংরক্ষণকর্মী শামীম খান আমাদের হাওরের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে নিয়ে যান। অসংখ্য বিল, জলচর পাখির আনাগোনা, হাঁসের ঝাঁক, আর গরু–মহিষের চরাই—সব মিলিয়ে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য।

তবে সেদিন ভাগ্য সহায় ছিল না। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, পরে নেমে আসে ঝুম বৃষ্টি। আমরা কাছের জেলেদের ডেরায় আশ্রয় নিয়ে ক্যামেরা রক্ষা করি। বৃষ্টি থামার পরও সারাদিন চষে বেড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত পাখি দুটির দেখা মেলেনি। প্রায় ১৪ কিলোমিটার হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাতের বাসে ঢাকায় ফিরেছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় আর তাদের দেখা যায়নি।

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি সামাজিক মাধ্যমে শামীম খানের পোস্টে তিনটি সারসের ছবি চোখে পড়ে। ধারণা করা হয়, আগের জোড়াটি এবার একটি ছানাসহ ফিরেছে। ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিক যাওয়া সম্ভব হয়নি। অবশেষে ২২ জানুয়ারি ছয়জনের একটি দল নিয়ে রওনা হই। পথে যানজটের কারণে সিলেটে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। দুপুরের দিকে হাওরের এক বাথানে শামীম খানের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি দূর থেকে বাইনোকুলারে পাখিগুলোর অবস্থান দেখান।

প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে বড় ঘাসঝোপের আড়ালে বসে পর্যবেক্ষণ শুরু করি। প্রায় আধঘণ্টা ধরে থেমে থেমে ছবি তোলা হয়। কিছু সময় পর পাখিগুলো উড়ে গেলে উড্ডয়নের ছবিও ধারণ করা সম্ভব হয়।

এই বিরল পাখির নাম পাতিসারস, ইংরেজিতে কমন বা ইউরেশিয়ান ক্রেন (Grus grus)। গ্রুইডি গোত্রের এ পাখি উত্তর ইউরোপ ও সাইবেরিয়ার আবাসিক; শীতে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিযান করে। বাংলাদেশে এটি অনিয়মিত ও তথ্যস্বল্প পরিযায়ী হিসেবে পরিচিত। উনিশ শতকে ঢাকা অঞ্চলে দেখা গেলেও পরে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত ছিল। ২০১৫ সালে ভোলায় পুনরায় দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী, মানিকগঞ্জ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট অঞ্চলে উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।

সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরের ওপর ছানাসহ উড়ন্ত পাতিসারস।

প্রাপ্তবয়স্ক পাতিসারসের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০–১৩০ সেন্টিমিটার, ওজন ৩–৬ কেজি। দেহ ও গলা লম্বা; সামগ্রিক পালক ধূসর। মুখমণ্ডল ও গলা কালো, মাথার উপরের অংশে লালচে ত্বক স্পষ্ট। চোখের পেছন থেকে সাদা দাগ ঘাড় বেয়ে পিঠ পর্যন্ত নেমে গেছে। চোখ লালচে, আর চঞ্চু ও পা ধূসরাভ। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারায় তেমন পার্থক্য না থাকলেও পুরুষ তুলনামূলক বড়।

এরা সাধারণত দিবাচর ও সতর্ক স্বভাবের। ছোট বা মাঝারি ঝাঁকে বিচরণ করে। ভোর ও গোধূলিতে খাদ্য অনুসন্ধানে সক্রিয় থাকে। জলাভূমিতে হেঁটে বা নরম কাদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে জলজ উদ্ভিদের কন্দ, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন খাদ্য সংগ্রহ করে; পাশাপাশি শস্য, বীজ ও ক্ষুদ্র প্রাণীও খায়। উড্ডয়নের আগে কিছুটা দৌড়ে গতি নেয়।

মে থেকে জুলাই তাদের প্রজননকাল। এ সময় সমন্বিত দৌড় ও নৃত্যভঙ্গি দেখা যায়। জলাশয়ের কাছে ডালপালা ও ঘাস দিয়ে বড় বাসা তৈরি করে, যা বছর বছর সংস্কার করে ব্যবহার করতে পারে। সাধারণত ২–৪টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই তা দেওয়া ও ছানা প্রতিপালনে অংশ নেয়। প্রায় এক মাসে ডিম ফুটে ছানা বের হয়; ৯ সপ্তাহের মধ্যে উড়তে শেখে, তবে পূর্ণ প্রজননক্ষমতা অর্জন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। আয়ুষ্কাল ১৩ বছরের বেশি।

— আ ন ম আমিনুর রহমান
পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ
অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়