
নদী, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাজশাহীবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নগরীতে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টায় নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট-এ আয়োজিত এ কর্মসূচিতে পরিবেশগত অবক্ষয়ের নানা দিক তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান বক্তারা।
‘নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন, বাংলাদেশ’ এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পুকুর ভরাট এবং কৃষিজমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, নগরীতে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় “সবুজ নগরী” হিসেবে পরিচিত রাজশাহী এখন প্রায়ই বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় উঠে আসছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, এলার্জি ও অন্যান্য রোগ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়।
পরিবেশবিদরা বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন রাজশাহীর পরিবেশ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। পরিকল্পনাহীন ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধার অভাব এবং নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা অবকাঠামো শহরের বায়ুপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে, তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে এবং যানজট বাড়িয়ে দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ পার্কিং ও ব্যবসা পরিচালনার ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
নদী ও জলাশয় দখল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা জানান, পদ্মা নদী তীরবর্তী লালনশাহ মুক্তমঞ্চ, টি-বাঁধসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখল, গ্যারেজ স্থাপন এবং চাঁদাবাজির কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং তীরবর্তী মানুষের জীবিকা এর ফলে ঝুঁকিতে পড়ছে।
এছাড়া অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে নদী, বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে দূষণ বাড়ছে। প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের কারণে পানি দূষিত হয়ে জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
মানববন্ধনে বক্তারা পরিবেশ রক্ষায় ৮ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বন্ধ, পুকুর ভরাট ও জলাশয় দখল বন্ধ এবং পুনরুদ্ধার, কৃষিজমি রক্ষা ও অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ণের ব্যবহার বন্ধ, নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ ও যানজট নিরসন,নগরবাসীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন ‘নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন, বাংলাদেশ’-এর রাজশাহী শাখার সভাপতি অ্যাড. এনামুল হক, সহসভাপতি ডা. ওয়াসিম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. হোসেন আলী পিয়ারা, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান আতিক, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষচন্দ্র হেমব্রম, আদিবাসী যুব পরিষদ রাজশাহী জেলার সভাপতি উপেন রবিদাস, নদী গবেষক ও হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বক্তারা বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি বাসযোগ্য, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব রাজশাহী গড়ে তুলতে প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং তরুণদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
রাজশাহী প্রতিনিধিঃ 























