
আইনগত অনুমোদন না থাকলেও দেশের মহাসড়কে প্রায় সাত শ বিলাসবহুল ডাবল ডেকার স্লিপার বাস চলাচল করছে। সন্ধ্যা নামলেই ঢাকা থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে এসব বাসের ব্যস্ততা শুরু হয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাইরে থেকে আধুনিক মনে হলেও এসব বাসের অনেকগুলো আসলে সাধারণ সিঙ্গেল ডেকার বাসের নিবন্ধন নিয়ে দোতলা স্লিপারে রূপান্তর করা হয়েছে। কিছু বাসে আবার ভুয়া ও জাল নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) খাতায় বাতিল (রাইট-অফ) ঘোষিত বাসের নম্বরও বসানো হয়েছে কোনো কোনো বাসে।
নম্বর নিয়ে গরমিলের দুই উদাহরণ
প্রথম উদাহরণ এস আই এন্টারপ্রাইজের একটি ডাবল ডেকার স্লিপার বাস, যার নম্বর ‘ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৫৮৯৮’। বিআরটিএর নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালে এই নম্বরের বাসটি ‘চেয়ারম্যান, বিআরটিসি’ নামে ৭২ আসনের সিঙ্গেল ডেকার অমনিবাস হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল।
দ্বিতীয় উদাহরণ ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে চলাচলকারী সেন্টমার্টিন সৌহার্দ নামের একটি স্লিপার বাস। এর নম্বর প্লেটে লেখা ‘চট্ট মেট্রো-ব-১১-২২৬২’, কিন্তু বিআরটিএর ডেটাবেজে এ নম্বরের কোনো তথ্যই মেলেনি। সেজুতি ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের ‘ঢাকা মেট্রো-ব-১২-১৮২২’ নম্বরের বাসটিও ডাবল ডেকার স্লিপার হিসেবে চলছে, অথচ ডেটাবেজে সেটি ৩৭ আসনের সাধারণ অমনিবাস।
প্রতিবেদক তিন দিন রাজধানীর আরামবাগ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখেছেন, অধিকাংশ ডাবল ডেকার স্লিপার বাসে ডিজিটাল নম্বর প্লেট নেই। এর বদলে নম্বর প্লেটের আদলে সবুজ স্টিকারে রং দিয়ে নম্বর লেখা হয়েছে। মার্সেডিজ বেঞ্জের মতো কিছু বিলাসবহুল বাসকেও ডাবল ডেকারে রূপান্তর করার চিত্র পাওয়া গেছে। এসব বাসের ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সনদও গত কয়েক বছর ধরে নবায়ন হয়নি। ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, আর রূপান্তরিত বাসে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
নামী কোম্পানির ব্যানারেও অননুমোদিত বাস
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক পরিচিত পরিবহন কোম্পানির ব্যানারে এসব অননুমোদিত ও ভুয়া নম্বরধারী স্লিপার বাস চলছে। এ তালিকায় রয়েছে গ্রিন লাইন, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, দেশ ট্রাভেলস, সেন্টমার্টিন পরিবহন, সেন্টমার্টিন এক্সপ্রেস, সেন্টমার্টিন সৌহার্দ, লন্ডন এক্সপ্রেস, ইম্পেরিয়াল এক্সপ্রেস, আইকনিক এক্সপ্রেস, ইউরো কোচ, গ্রিন সেন্টমার্টিন, বেঙ্গল পরিবহন, এসপি গোল্ডেন লাইন, শাহ ফতেহ আলী, পূর্বাশা পরিবহন, দোয়েল এক্সপ্রেস, এশিয়া এয়ারকন, রিলাক্স পরিবহন, লাল সবুজ পরিবহন, গোল্ডেন লাইন, রয়েল কোচ, রয়েল ট্রাভেলস, সেজুতি ট্রাভেলস, স্কয়ার ট্রাভেলস, পাবনা এক্সপ্রেস, যমুনা লাইন, কাতার ও নবাব এক্সপ্রেস।
কাঠামো বদলালে ঝুঁকি কোথায়
সিঙ্গেল ডেকার বাসের কাঠামো পাল্টে দোতলা স্লিপার কোচ বানালে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় বাসের ভারসাম্য নিয়ে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ায়। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, আসন বিন্যাস বা মূল কাঠামো বদলানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এ জন্য জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মাঝেমধ্যে বিআরটিএ কিছু ব্যবস্থা নিলেও পুলিশের উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপের খবর মেলেনি। বিআরটিএর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বাসের অনুমোদন তারা দেননি। অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে অন্তত আটটি বাস জব্দ করা হয়েছে। তবে জনবলের সংকটে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবস্থা নিতে তারা একাধিকবার তালিকাসহ পুলিশকে চিঠিও দিয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, এত বাস ডাম্পিং করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অভিযান শুরু করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা বিআরটিএর একটি নথিতে ৬৬২টি অবৈধ ও অননুমোদিত ডাবল ডেকার স্লিপার বাস শনাক্তের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩০টি ৪১ থেকে ৫২ আসনের সিঙ্গেল ডেকার অমনিবাস হিসেবে নিবন্ধিত ছিল, পরে অনুমোদন ছাড়াই কাঠামো বদলে দোতলা করা হয়েছে। নথিতে আরও বলা হয়েছে, ২৭টি স্লিপার বাস সম্পূর্ণ জাল বা ভুয়া নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে চলছে। আর বিআরটিএর স্ক্র্যাপ বা রাইট-অফ ঘোষিত পাঁচটি বাসের নম্বরও অবৈধভাবে ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। অর্থাৎ কাগজে যে বাসের অস্তিত্ব নেই, সেটিই চলছে মহাসড়কে।
তবে বাসমালিকদের দাবি, বিআরটিএর অনুমোদন নিয়েই অধিকাংশ বাস চলাচল শুরু করেছে। চাপে পড়ে এখন বিআরটিএ দায় এড়াতে চাইছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আরামের আড়ালে এসব বাস মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। আমদানিকারক, মালিক, বডি নির্মাতা, সরকারের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ, সবাই এর জন্য সমানভাবে দায়ী। তাদের হিসাবে, একতলা বাসের চেসিসের ওপর বাড়তি কাঠামো বসিয়ে আট শতাধিক দোতলা স্লিপার কোচ মহাসড়কে চলছে। যাত্রী নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনায় দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগ কম, ফলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।
পরিবহন ও দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, বিদেশ থেকে আনা অনেক চেসিস একতলা বাসের উপযোগী। স্থানীয় গ্যারেজ বা বডি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে সেগুলোর কাঠামো বদলে স্লিপার বা ডাবল ডেকার বানানো হচ্ছে। এতে বাসের উচ্চতা, ওজন, ভারসাম্য ও যাত্রী ধারণক্ষমতা পাল্টে যায়। কাঠামো বদলের কারণে চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেক ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ পড়তে পারে। সড়কে ওঠার আগেই অনুমোদনহীন রূপান্তর কেন শনাক্ত হয়নি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
হাই কোর্টে রিট, বিআরটিএর বক্তব্য
স্লিপার বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাই কোর্টে একাধিক রিট হয়েছে, যার দুটি এখন বিচারাধীন। বাসমালিকরাও চলাচলের অনুমতি চেয়ে উচ্চ আদালতে গিয়েছিলেন, কিন্তু আদালত তাতে সাড়া দেননি। আদালত জানিয়েছেন, বিআরটিএর অনুমোদনের বাইরে কোনো বাস সড়কে চলতে পারবে না।
বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, অনেক বাস প্রথমে সাধারণ একতলা বাস হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল, পরে মালিকরা কাঠামো বদলে স্লিপারে রূপান্তর করেছেন। বিআরটিএ ৬৬২টি অবৈধ বাস শনাক্ত করে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত চলছে এবং রূপান্তরের কাজ হয় এমন গ্যারেজেও অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, বিআরটিএর চিঠি তারা কিছুদিন আগে পেয়েছেন। তবে এত বেশি সংখ্যক কোচ ডাম্পিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। কোচগুলো দামি এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে, তাই জায়গা খোঁজা হচ্ছে। জায়গা পেলে অভিযান শুরু হবে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, গত সোমবার বিআরটিএর চিঠি পাওয়ার পর মঙ্গলবার সব রিজিয়নকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে রাতে মহাসড়কে বাস থামিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তাই চেকপোস্ট বসালে চালকরা অনেক সময় থামতে চাইবেন না, এতে দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
ফিটনেস ও ট্যাক্সে রাজস্ব ফাঁকি
ভুয়া নম্বর প্লেট বা রাইট-অফ বাসের নম্বর ব্যবহার করায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বৈধ বাসের নিবন্ধন, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন ও রুট পারমিটের বিপরীতে সরকার নির্ধারিত ফি ও কর পায়। অন্য গাড়ির নম্বর ব্যবহার করলে বা নিবন্ধন ছাড়া চললে সেই সুযোগ থাকে না। অন্তত ১৭টি ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের নথি যাচাই করে একটিরও নবায়নকৃত ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সনদের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একতলা বাসের নিবন্ধন নিয়ে সেটিকে দোতলা করে ফেললে নিবন্ধিত যানের সঙ্গে সড়কে চলা যানের আর কোনো মিল থাকে না। ফলে ফিটনেস পরীক্ষার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। নবায়নে গেলে বাস আটকে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় মালিকরা নবায়ন করেন না। একই সূত্র প্রশ্ন তুলেছে, পুলিশের সামনে দিয়ে এসব বাস কীভাবে চলাচল করে।
বাসমালিক সমিতির অবস্থান
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, স্লিপার ও ডাবল ডেকার বাস নিয়ে বিআরটিএর অবস্থানে অসঙ্গতি আছে। অনেক বাসের নিবন্ধন, রোড পারমিট ও ফিটনেস সনদ থাকার পরও এখন সেগুলোকে অনুমোদনহীন বলা হচ্ছে। অথচ পরিদর্শন করে নিবন্ধন ও ফিটনেস দেওয়ার দায় বিআরটিএরও রয়েছে।
তিনি জানান, এসব বাসের বৈধতা ও কারিগরি নিরাপত্তা যাচাইয়ে বুয়েটের মাধ্যমে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ছয় মাস পরীক্ষা শেষে বুয়েট একটি কারিগরি প্রতিবেদন দিয়েছে। ডাবল ডেকার বাসের কাঠামো, নিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে নতুন নীতিমালার কাজও চলছে।
সাইফুল আলমের মতে, কারিগরিভাবে নিরাপদ ও অনুমোদনযোগ্য বাসগুলোকে নিয়ম মেনে বৈধতা দেওয়া উচিত, আর ঝুঁকিপূর্ণ ও অননুমোদিত বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহারকারী বাসের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান জরুরি। এটিকে গুরুতর অন্যায় উল্লেখ করে দ্রুত এসব বাস বন্ধের দাবি জানান তিনি।
আসছে স্লিপার বাস নীতিমালা
সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনার পর প্রথমবারের মতো স্লিপার বাসের বডি নির্মাণ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করছে সরকার। ‘স্লিপার বাস গাইডলাইন/নীতিমালা, ২০২৬’ শিরোনামের খসড়া তৈরি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠিয়েছে বিআরটিএ।
খসড়ায় যেসব প্রস্তাব রয়েছে-পুরোনো বা ব্যবহৃত চেসিসে বাস তৈরি নিষিদ্ধ,পেছনে টেনডেম এক্সেল এবং সব এক্সেলে এয়ার সাসপেনশন বাধ্যতামূলক,এবিএস বা উন্নত ব্রেকিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক,প্রতিটি বার্থে ৩০০ কেজি ওজন বহনের সক্ষমতা,নিরাপত্তাবেষ্টনী, হাতলসহ সিঁড়ি, কলিং ও রিডিং লাইট,বাসের সর্বোচ্চ ওজন ২১ টন এবং উচ্চতা ৪.২৫ মিটারের মধ্যে সীমিত রাখা,অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার, স্মোক ডিটেক্টর, জরুরি দরজা-জানালা এবং কাচ ভাঙার হাতুড়ি রাখা।
অধিকার ডেস্কঃ 






















