
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার লাভজনক মল্লিকপুর পশুহাট ইজারা প্রক্রিয়া ঘিরে উঠেছে স্বজনপ্রীতি, নীতিমালা লঙ্ঘন, গোপন সমঝোতা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির গুরুতর অভিযোগ। দরপত্রে একজন দরদাতাও অংশ না নেওয়ার পর পুনঃবিজ্ঞপ্তি ছাড়া ‘খাস আদায়’ দেখিয়ে গোপনে এক বছরের জন্য হাট বন্দোবস্ত দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে-আসলে কার নির্দেশে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কার স্বার্থে দেওয়া হলো মল্লিকপুর পশুহাট?
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে অভিযোগকারী মো. এরফান রেজা দাবি করেছেন, গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম রাব্বানী সরদারের স্বাক্ষরে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য ১৮টি হাট-বাজার ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে ০২ নং ক্রমিকে থাকা মল্লিকপুর পশুহাটের সরকারি মূল্য ধরা হয় ৫৩ লাখ ৫ হাজার ৬১৪ টাকা।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত চার দফায় দরপত্র জমার সুযোগ থাকলেও অভিযোগ অনুযায়ী একটি দরপত্রও জমা পড়েনি। বিধি অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে পুনরায় দরপত্র আহ্বান অথবা সরকারি নীতিমালা অনুসারে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও, অভিযোগ উঠেছে-সব কিছু হয়েছে রহস্যজনক গোপনীয়তায়।
অভিযোগকারী জানান, ১২ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, হাটটি খাস আদায়ে দেওয়া হবে। পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোছা. সুলতানা রাজিয়া তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্ভাব্য দর প্রস্তাব জানতে চান। তিনি সাপ্তাহিক প্রতি হাটে ১ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও পরে আর কোনো অগ্রগতি জানানো হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, উপজেলা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা যোগসাজশে গোপনে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে খাস আদায়ের নামে এক বছরের জন্য হাটটি বন্দোবস্ত দিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নথি বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো-একই বিষয়ে প্রশাসনের দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্যে বিস্তর অসঙ্গতি।
ফতেপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, বর্তমান এসিল্যান্ড গত বছরের মতো এবারও স্থানীয় আযম নামে এক ব্যক্তিকে ৫৫ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য হাট দিয়েছেন।
অন্যদিকে খাস আদায়কারী হিসেবে পরিচিত আযমও জানান, তিনি ৫৫ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন।
কিন্তু ভারপ্রাপ্ত ইউএনও ও এসিল্যান্ড মোছা. সুলতানা রাজিয়া বলেন, কোনো এক বছরের ইজারা দেওয়া হয়নি, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে বিধি মোতাবেক পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত খাস আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যপক প্রচার প্রচারনার মাধ্যমে পশু হাট টি দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা নেওয়ার জন্য। কিন্তু দরপত্রের মাধ্যমে কেউ অংশ গ্রহন করেন নি।
এই দুই বক্তব্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ধোঁয়াশা। প্রশ্ন উঠেছে-যদি কেবল খাস আদায়ের অনুমতি হয়, তবে ৫৫ লাখ টাকার এক বছরের বন্দোবস্তের তথ্য এলো কোথা থেকে? আর যদি এক বছরের জন্য দেওয়া হয়, তবে তা কোন কর্তৃত্বে?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৪৩২ বাংলা সালেও একই ব্যক্তি খাস আদায়ের নামে হাট পরিচালনা করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর একই চক্র খাস আদায়ের আড়ালে রাজস্ব ফাঁকি ও অনিয়মে জড়িত।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন-সরকারি নির্ধারিত মূল্যে হাট ইজারা না দিয়ে খাস আদায়ে দিলে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে খাস আদায়ে আদায়কারী কর্তৃপক্ষ ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় সুবিধা পায়।
তাহলে কি এই আর্থিক সুবিধার কারণেই খাস আদায়ের আড়ালে চলছে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র?-এমন প্রশ্ন উঠছে জনমনে।
হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন অপু জানান, পশু হাট ইজারা হয়নি। তবে ১ বছরের জন্য খাস আদায় করেতে দেওয়া হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবুল কাশেম নামের একব্যাক্তি কে সেটা শুনেছি।
ক্ষোভ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের- স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, একটি লাভজনক পশুহাটের ইজারা নিয়ে যদি এ ধরনের অস্বচ্ছতা থাকে, তাহলে সাধারণ দরদাতা ও ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার হবেন।
একাধিক ব্যবসায়ী বলেন,“হাট-বাজার ইজারা যদি গোপনে ভাগবাটোয়ারা হয়, তাহলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা থাকবে কোথায়?”
অভিযোগকারী জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি করেছেন। অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও।
অভিযোগকারী মোঃ এরফান রেজা বলেন, হাট – বাজার নীতিমালা অনুযায়ী মল্লিকপুর পশু হাট খাস আদায়ে নিয়ম মানা হয়নি।
জেলা প্রশাসনে দায়ের হওয়া অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ নজ করার কোন মন্তব্য পাওয়া যায় নি।
এ ঘটনায় স্থানীয় মহলের প্রশ্ন এখন-মল্লিকপুর পশুহাট কি ‘খাস আদায়’-এর আড়ালে গোপন ইজারার নতুন মডেল, নাকি প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে চলছে সংঘবদ্ধ স্বার্থসংশ্লিষ্ট খেলা?
অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে স্বজনপ্রীতি, রাজস্ব ক্ষতি ও প্রশাসনিক গোপন বন্দোবস্তের বিস্ফোরক চিত্র-এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 






















