
করোনা মহামারীর ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জীবনের ছন্দও হারিয়েছেন হাজারো শ্রমিক। ড্রাগন সোয়েটার বিডি লিমিটেড বন্ধ হওয়ার পর দেড় হাজারের বেশি শ্রমিকের মতো মো. আব্দুল কুদ্দুছও পড়েন চরম অনিশ্চয়তায়। ১৮ বছর ধরে কাজ করা এই ফ্লোর ম্যানেজারের সাত মাসের বেতনসহ প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য পাওনা আজও পুরোপুরি মেলেনি।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর বকেয়া বেতন আংশিক পরিশোধ হলেও অন্যান্য আইনগত পাওনা না পাওয়ায় শ্রমিকরা প্রথমে মালিকপক্ষের কাছে এবং পরে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে কিস্তিতে পাওনা পরিশোধের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে তা পূর্ণতা পায়নি। বাধ্য হয়ে ২০২১ সালে ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা—যা আজও বিচারাধীন।
শ্রম আইনের ২১১(৬) ধারা অনুযায়ী অভিযোগ দাখিলের ৬০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র উল্টো। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে হাজার হাজার মামলা।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে শ্রম আদালত ও শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার ৫৪৬টি। এর মধ্যে ৬ মাসের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে প্রায় ১৩ হাজার ৮৩৩টি মামলা। শুধু ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
ঢাকার তিনটি শ্রম আদালতেই রয়েছে ১০ হাজারের বেশি মামলা। গাজীপুরে ৬ হাজারের বেশি এবং নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালসহ অন্যান্য জেলাতেও শত শত মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
আইনজীবীরা বলছেন, আইনের সময়সীমা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। বিবাদীপক্ষের বারবার সময় আবেদনসহ নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতায় মামলা দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ছে। ফলে ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমিকরাই।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতে, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অনেক শ্রমিক শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে পারেন না। জীবিকার তাগিদে নতুন কাজে যুক্ত হতে গিয়ে ন্যায্য পাওনার লড়াই থেমে যায় মাঝপথেই।
শ্রম আদালতে কর্মরত আইনজীবীরা বলছেন, শ্রম আদালতের কাঠামো ও জনবল বাড়ানো জরুরি। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক পৃথক শ্রম আদালত স্থাপন না হলে এই সংকট আরও বাড়বে।
অন্যদিকে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, সময় আবেদনের কারণে অনেক মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিষ্পত্তির হার কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে দাবি তাদের।
শ্রম বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা মনে করছেন, শ্রম আদালতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত, কার্যকর ও স্বচ্ছ করা জরুরি। নইলে শ্রমিকদের অধিকার শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে—বাস্তবে নয়।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 























