ঢাকা ০৮:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি সাইনবোর্ডে ‘ডাক্তার’, আসলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট! চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে ‘অবরুদ্ধ করে’ পিটুনি, আহত ৭; সাংবাদিক-পুলিশও লাঞ্ছিত “মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে আর রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন নয়”- তথ্যমন্ত্রী শিবগঞ্জে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আগুনের খেলায় মেতে উঠল শিশুরা মাগুরায় শুরু দুই দিনব্যাপী “হাজরাপুরী লিচু মেলা-২০২৬” দেবিদ্বারে ছেলের পিটুনিতে বাবার মৃত্যু পাটগ্রাম সীমান্তে সাবেক কূটনীতিক আটক, জব্দ ৭ পাসপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উদ্বোধনে গৌরনদীতে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু পারিবারিক কলহের জেরে নাটোরে বৃদ্ধ স্বামী খুন, স্ত্রী আটক
লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন

পরিপক্ব হলেই আম পাড়বেন চাষিরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাতিল ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’

সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী।

দেশের আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবারও থাকছে না বহুল আলোচিত ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’। নির্ধারিত তারিখের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই গাছে আম পরিপক্ব হলেই তা সংগ্রহ ও বাজারজাত করতে পারবেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তবে কাঁচা, অপরিপক্ব কিংবা রাসায়নিকযুক্ত আম বাজারজাতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত “ম্যাংগো ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, বিষমুক্ত আম উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ” বিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী।

সভায় জেলার আমচাষি, বাগান মালিক, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, কৃষি কর্মকর্তা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন আম সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় বক্তারা বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম অর্জন করেছে। তবে প্রতিবছর কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে অপরিপক্ব আম বাজারজাত, অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ ও কৃত্রিমভাবে পাকানো আম নিয়ে অভিযোগ ওঠে। এতে জেলার ঐতিহ্য ও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ বেঁধে না দিয়ে গাছে আম পরিপক্ব হওয়ার পরই তা সংগ্রহ করা যাবে। বক্তারা বলেন, আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ ও জাতভেদে আমের পরিপক্বতার সময় ভিন্ন হয়। তাই ক্যালেন্ডার নির্ভর পদ্ধতি অনেক সময় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সভায় জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী বলেন,“চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম শুধু একটি ফল নয়, এটি এ জেলার অর্থনীতির প্রাণ। তাই কোনোভাবেই কাঁচা বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা আম বাজারজাত করতে দেওয়া হবে না।” তিনি আরও বলেন,“আম পরিপক্ব হলেই তা সংগ্রহ করা যাবে। তবে অপরিপক্ব আম বাজারে এলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো মৌসুমজুড়ে প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিশেষ অভিযান চলবে।”

সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াসিন আলী জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন,“বিষমুক্ত আম উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও নিবিড় তদারকি জোরদার করা হয়েছে।”

আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মানসম্মত ও রাসায়নিকমুক্ত আম উৎপাদনের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন,“নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গুণগত মান নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

সভায় গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি ও আশ্বিনা জাতের আম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিক ম্যাংগো ক্যালেন্ডার থাকছে না, তবুও কৃষি বিভাগ জাতভেদে আমের স্বাভাবিক পরিপক্বতার সময় সম্পর্কে চাষিদের পরামর্শ দেবে বলে জানানো হয়েছে।

সভায় বক্তারা শুধু কাঁচা আম বিক্রির ওপর নির্ভর না করে আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আমের জুস, পাল্প, আচার, শুকনো আমসহ বহুমুখী পণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা আরও লাভবান হবেন বলে মত দেন তারা।

এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে নিরাপদ আম পৌঁছে দেওয়া, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। জেলায় মোট আম গাছের সংখ্যা ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৬টি।

প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে এবার মাঠে থাকবে বিশেষ মনিটরিং টিম। লক্ষ্য একটাই—দেশজুড়ে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাবে নিরাপদ, বিষমুক্ত ও পরিপক্ব চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি

লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন

পরিপক্ব হলেই আম পাড়বেন চাষিরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাতিল ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’

প্রকাশের সময়ঃ ০৮:১৯:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

দেশের আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবারও থাকছে না বহুল আলোচিত ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’। নির্ধারিত তারিখের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই গাছে আম পরিপক্ব হলেই তা সংগ্রহ ও বাজারজাত করতে পারবেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তবে কাঁচা, অপরিপক্ব কিংবা রাসায়নিকযুক্ত আম বাজারজাতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত “ম্যাংগো ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, বিষমুক্ত আম উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ” বিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী।

সভায় জেলার আমচাষি, বাগান মালিক, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, কৃষি কর্মকর্তা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন আম সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় বক্তারা বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম অর্জন করেছে। তবে প্রতিবছর কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে অপরিপক্ব আম বাজারজাত, অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ ও কৃত্রিমভাবে পাকানো আম নিয়ে অভিযোগ ওঠে। এতে জেলার ঐতিহ্য ও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ বেঁধে না দিয়ে গাছে আম পরিপক্ব হওয়ার পরই তা সংগ্রহ করা যাবে। বক্তারা বলেন, আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ ও জাতভেদে আমের পরিপক্বতার সময় ভিন্ন হয়। তাই ক্যালেন্ডার নির্ভর পদ্ধতি অনেক সময় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সভায় জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী বলেন,“চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম শুধু একটি ফল নয়, এটি এ জেলার অর্থনীতির প্রাণ। তাই কোনোভাবেই কাঁচা বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা আম বাজারজাত করতে দেওয়া হবে না।” তিনি আরও বলেন,“আম পরিপক্ব হলেই তা সংগ্রহ করা যাবে। তবে অপরিপক্ব আম বাজারে এলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো মৌসুমজুড়ে প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিশেষ অভিযান চলবে।”

সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াসিন আলী জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন,“বিষমুক্ত আম উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও নিবিড় তদারকি জোরদার করা হয়েছে।”

আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মানসম্মত ও রাসায়নিকমুক্ত আম উৎপাদনের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন,“নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গুণগত মান নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

সভায় গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি ও আশ্বিনা জাতের আম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিক ম্যাংগো ক্যালেন্ডার থাকছে না, তবুও কৃষি বিভাগ জাতভেদে আমের স্বাভাবিক পরিপক্বতার সময় সম্পর্কে চাষিদের পরামর্শ দেবে বলে জানানো হয়েছে।

সভায় বক্তারা শুধু কাঁচা আম বিক্রির ওপর নির্ভর না করে আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আমের জুস, পাল্প, আচার, শুকনো আমসহ বহুমুখী পণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা আরও লাভবান হবেন বলে মত দেন তারা।

এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে নিরাপদ আম পৌঁছে দেওয়া, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। জেলায় মোট আম গাছের সংখ্যা ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৬টি।

প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে এবার মাঠে থাকবে বিশেষ মনিটরিং টিম। লক্ষ্য একটাই—দেশজুড়ে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাবে নিরাপদ, বিষমুক্ত ও পরিপক্ব চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম।