ঢাকা ১১:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ

হাসিকে অস্ত্র বানানো এক কিংবদন্তি- জন্মদিনে হুমায়ূন ফরীদিকে স্মরণ

আজ হুমায়ুন ফরীদির জন্মদিন

বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু শিল্পী আছেন, যাদের উপস্থিতি সময়কে অতিক্রম করে যায়। হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন তেমনই এক অসাধারণ অভিনেতা, যিনি অভিনয়কে শুধু পেশা নয়, শিল্পের এক গভীর প্রকাশে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সংলাপ, চোখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ দক্ষতা আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে।

আজ ২৯ মে এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন কামরুল ইসলাম। পরবর্তীতে তিনি হুমায়ূন ফরীদি নামেই বাংলা অভিনয় জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি আসে। স্বাধীনতার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেখানেই নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

নাট্যদল ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শুরু হয় তাঁর অভিনয়ের যাত্রা। মঞ্চনাটক তাঁকে অভিনয়ের গভীরতা ও চরিত্র নির্মাণের আলাদা এক শক্ত ভিত এনে দেয়। সেই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁকে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে ব্যতিক্রমী উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করতেন না, যেন নিজের ভেতরে ধারণ করতেন। ‘সংশপ্তক’ নাটকের কানকাটা রমজান চরিত্রটি আজও বাংলা নাটকের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘নিকষ অন্ধকার’ ও ‘শীতের পাখি’সহ অসংখ্য নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

চলচ্চিত্রেও তিনি খলচরিত্র উপস্থাপনায় নতুন ধারা তৈরি করেন। অতিনাটকীয়তার বাইরে এসে তিনি খলনায়ক চরিত্রকে বাস্তব, মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিদীপ্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে চলচ্চিত্রে তাঁর শক্ত অবস্থান গড়ে ওঠে। ‘দহন’, ‘বাচ্চু বাদশাহ’, ‘সন্ত্রাস’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘মাতৃত্ব’ ও ‘জয়যাত্রা’র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।

২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মাননা লাভ করেন। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।

পর্দার বাইরে হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনে ছিল নানা টানাপোড়েন ও নিঃসঙ্গতার ছাপ। অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ছিল আলোচনায়। ১৯৮৪ সালে তাদের বিয়ে হয় এবং ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ ঘটে।

অভিনয়ের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় মানে শুধু সংলাপ বলা নয়; বরং চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা। তাই আজও নতুন প্রজন্মের অনেক অভিনেতার কাজে তাঁর অভিনয়শৈলীর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন ফরীদি। তবে তাঁর প্রয়াণেও থেমে যায়নি তাঁর প্রভাব। বাংলা নাটক-চলচ্চিত্রের অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র আর দর্শকের আবেগে তিনি আজও সমানভাবে জীবন্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিকে অস্ত্র বানানো এক কিংবদন্তি- জন্মদিনে হুমায়ূন ফরীদিকে স্মরণ

হাসিকে অস্ত্র বানানো এক কিংবদন্তি- জন্মদিনে হুমায়ূন ফরীদিকে স্মরণ

প্রকাশের সময়ঃ ০৮:০৮:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু শিল্পী আছেন, যাদের উপস্থিতি সময়কে অতিক্রম করে যায়। হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন তেমনই এক অসাধারণ অভিনেতা, যিনি অভিনয়কে শুধু পেশা নয়, শিল্পের এক গভীর প্রকাশে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সংলাপ, চোখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ দক্ষতা আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে।

আজ ২৯ মে এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন কামরুল ইসলাম। পরবর্তীতে তিনি হুমায়ূন ফরীদি নামেই বাংলা অভিনয় জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি আসে। স্বাধীনতার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেখানেই নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

নাট্যদল ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শুরু হয় তাঁর অভিনয়ের যাত্রা। মঞ্চনাটক তাঁকে অভিনয়ের গভীরতা ও চরিত্র নির্মাণের আলাদা এক শক্ত ভিত এনে দেয়। সেই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁকে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে ব্যতিক্রমী উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করতেন না, যেন নিজের ভেতরে ধারণ করতেন। ‘সংশপ্তক’ নাটকের কানকাটা রমজান চরিত্রটি আজও বাংলা নাটকের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘নিকষ অন্ধকার’ ও ‘শীতের পাখি’সহ অসংখ্য নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

চলচ্চিত্রেও তিনি খলচরিত্র উপস্থাপনায় নতুন ধারা তৈরি করেন। অতিনাটকীয়তার বাইরে এসে তিনি খলনায়ক চরিত্রকে বাস্তব, মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিদীপ্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে চলচ্চিত্রে তাঁর শক্ত অবস্থান গড়ে ওঠে। ‘দহন’, ‘বাচ্চু বাদশাহ’, ‘সন্ত্রাস’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘মাতৃত্ব’ ও ‘জয়যাত্রা’র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।

২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মাননা লাভ করেন। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।

পর্দার বাইরে হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনে ছিল নানা টানাপোড়েন ও নিঃসঙ্গতার ছাপ। অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ছিল আলোচনায়। ১৯৮৪ সালে তাদের বিয়ে হয় এবং ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ ঘটে।

অভিনয়ের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় মানে শুধু সংলাপ বলা নয়; বরং চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা। তাই আজও নতুন প্রজন্মের অনেক অভিনেতার কাজে তাঁর অভিনয়শৈলীর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন ফরীদি। তবে তাঁর প্রয়াণেও থেমে যায়নি তাঁর প্রভাব। বাংলা নাটক-চলচ্চিত্রের অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র আর দর্শকের আবেগে তিনি আজও সমানভাবে জীবন্ত।