
সিলেটের বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কারা এই নামে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং এর পেছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার।
ইউএনও বলেন, নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয় জড়িত কি না, সেটিও প্রশাসন যাচাই করছে। তবে প্রাথমিকভাবে নৌকাবাইচের বিরোধিতাকারীদের আপত্তির কারণ হিসেবে চলাচলে সমস্যা, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ফসলহানি ও নদীভাঙনের বিষয়গুলো জানা গেছে।
বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে পর্যালোচনার জন্য লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নৌকাবাইচের পক্ষে বা বিপক্ষে থাকা কোনো পক্ষ প্রশাসনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেনি বলে জানান ইউএনও।
এর আগে শুক্রবার রাতে বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র প্রচারণা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় প্রশাসন ও বিশিষ্টজনদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। শনিবার রাতে বারইগ্রাম বাজারে নৌকাবাইচের পক্ষ ও বিপক্ষের লোকজনকে নিয়ে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সোনাই নদীতে লাউতা ও বাহাদুরপুরের যুবকদের উদ্যোগে আগামী ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজনের কথা রয়েছে। এ আয়োজন বন্ধের দাবিতে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ‘তৌহিদী জনতা’র নামে একটি পোস্টারও ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে সেটি সরিয়ে নেন প্রচারকারী যুবক মাসুম বিন নুর উদ্দিন।
মাসুম বিন নুর উদ্দিন জানান, স্থানীয় মুরব্বি, মাওলানা ও ব্যবসায়ীদের অনুরোধে তিনি পোস্টারটি ফেসবুকে দিয়েছিলেন। শনিবার দুপুরে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সোনাই নদীতে এ ধরনের আয়োজনের কারণে এলাকার বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হয় বলে তাদের ধারণা। বিশেষ করে কৃষকদের ফসলহানি এবং নদীপাড়ের মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনা করেই তারা প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি মাসুম। তিনি জানান, মাওলানা আব্দুল হক, হাফিজ শিব্বির আহমদ ও স্থানীয় ব্যবসায়ী হোসেন আহমদ তাকে পোস্টারটি প্রকাশের অনুরোধ করেছিলেন।
নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে মাওলানা আব্দুল হক
বড়লেখার হাটবন্দ এলাকার এফ আর মহী সুন্না মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মো. আব্দুল হক নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
তার দাবি, নৌকাবাইচসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি জুয়ার পর্যায়ে পড়তে পারে এবং ইসলাম এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনুমোদন করে না। এ কারণে তিনি নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নৌকাবাইচ হলে সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং নদীভাঙন বাড়তে পারে বলেও তিনি দাবি করেন। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের আশঙ্কার কথাও জানান তিনি।
আব্দুল হক বলেন, শনিবার জোহরের নামাজের পর বারইগ্রাম বাজারে সভা করে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিযোগিতা বন্ধের উদ্যোগ নিতে মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
তিনি আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার বারইগ্রাম মসজিদে এবং শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিভিন্ন মসজিদে নৌকাবাইচের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা চালাতে নুর উদ্দিনকে তারাই অনুরোধ করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নৌকাবাইচ বাংলার ঐতিহ্যের অংশ: আয়োজকরা
নৌকাবাইচের অন্যতম উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধের সম্পর্ক নেই। এর আগেও তারা শান্তিপূর্ণভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন করেছেন এবং স্থানীয় মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে এলাকার কিছু যুবক নৌকাবাইচের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালেও আয়োজকদের সঙ্গে তারা সরাসরি আলোচনা করেননি। সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে।
হেলাল উদ্দিন আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হবে। ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান গৌছ উদ্দিন এবং মোল্লাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি দেখছেন বলেও জানান তিনি।
অধিকার ডেস্কঃ 






















