
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে কাজের ধরন ও কর্মসংস্থানের বাজারে বড় পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশের জন্যও এ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরি পোশাক, বিপিও এবং বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে এআই ও অটোমেশনের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
২০১৭ সালে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অনলাইন লেবার ইনডেক্সে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমের প্রায় ১৬ শতাংশ সরবরাহের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছিল। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়। এই খাতের অর্থনৈতিক পরিসরও উল্লেখযোগ্য। তবে পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ প্রশিক্ষকের সংকট এবং উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, কম দক্ষতা ও কম পারিশ্রমিকের রুটিনভিত্তিক আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে দ্রুত এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা অ্যানালিটিকস ও অটোমেশনের মতো উচ্চমূল্যের দক্ষতায় যেতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক অনলাইন শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান চাপে পড়তে পারে।
চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব কতটা?
এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি চাকরি হারাবেন—বিষয়টি এতটা সরল নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি চারজন কর্মীর মধ্যে প্রায় একজন এমন পেশায় কাজ করেন, যেখানে জেনারেটিভ এআইয়ের কোনো না কোনো মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো পেশা বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে কাজের দায়িত্ব, পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি।
ক্লারিক্যাল বা দাপ্তরিক ধরনের কাজ এআইয়ের প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা পেশাগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশেও ডেটা প্রসেসিং, কল সেন্টার, বিপিও এবং প্রশাসনিক কাজের কিছু অংশ ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতেও বদলাবে কাজের ধরন
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাক। এ খাতে ইতোমধ্যে মান নিয়ন্ত্রণ, চাহিদা পূর্বাভাস, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং পণ্য মজুত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
এআই ও অটোমেশনের ফলে পুনরাবৃত্তিমূলক কিছু কাজ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি পরিচালনা, ডেটা বিশ্লেষণ, যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক উৎপাদন পরিকল্পনায় দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন বাড়তে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তির পরিবর্তন শুধু চাকরি কমাবে—এমন ধারণার পরিবর্তে কর্মীদের দক্ষতার ধরন বদলে যাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রবাসী কর্মসংস্থানেও আসতে পারে পরিবর্তন
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে কর্মরত। পরিবহন, উৎপাদন, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন সেবা খাতে অটোমেশন বাড়লে স্বল্পদক্ষ কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা প্রশিক্ষণ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও বিপিওতে নতুন বাস্তবতা
ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ ট্রান্সক্রিপশন, মৌলিক কনটেন্ট তৈরি এবং কিছু প্রাথমিক সফটওয়্যারভিত্তিক কাজ এখন বিভিন্ন এআই টুলের সাহায্যে করা সম্ভব। ফলে এসব কাজের ওপর নির্ভরশীল ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
তবে একই সময়ে এআই ব্যবহার করে উন্নত সফটওয়্যার তৈরি, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, অটোমেশন, ক্লাউড সেবা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি কাজের দক্ষতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাও জরুরি।
জাতীয় এআই নীতির পথে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে এআই নিয়ে নীতিগত প্রস্তুতিও এগোচ্ছে। ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পলিসি ২০২৬-৩০-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি এআই পলিসি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, জনপরামর্শের পর পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে নীতিটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে আইসিটি বিভাগের নেতৃত্বে ইউনেস্কো, ইউএনডিপি ও এটুআইয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশের এআই প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে নীতি, অবকাঠামো, ডেটা, শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি
এআইনির্ভর অর্থনীতির জন্য শুধু নীতিমালা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে এআই, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিং ও অটোমেশনের মতো বিষয়ে দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই হাজার এআই-সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এআই শিক্ষাকে আরও কাঠামোবদ্ধ করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং নৈতিক এআই ব্যবহারের বিষয়টি পাঠ্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী ও মেয়েদের এসটিইএম এবং এআই শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
অবকাঠামো ও ডেটার ঘাটতি বড় বাধা
আধুনিক এআই প্রযুক্তি তৈরি ও পরিচালনার জন্য শক্তিশালী কম্পিউটিং ব্যবস্থা, জিপিইউ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, ক্লাউড সেবা এবং মানসম্মত ডেটা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব অবকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয়।
ইউনেস্কোর বাংলাদেশ এআই প্রস্তুতি প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন। ফলে ডিজিটাল বিভাজন কমানোও এআইভিত্তিক কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী এআই প্রযুক্তি তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় ভাষার ডেটাসেট ও দেশীয় বাস্তবতাভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের নিজস্ব এআই সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়তে হবে
ব্যাংকিং, পোশাক, কৃষি, শিক্ষা ও সরকারি সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। তবে শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকলে এআই অর্থনীতির বড় অংশের মূল্য বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের কাছে চলে যেতে পারে।
দেশীয় গবেষণা, স্টার্টআপ, মেধাস্বত্ব, ডেটা এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো তাই জরুরি। ২০২৬ সালের জুনে সরকার ও ইউনেস্কোর উদ্যোগে সরকারি কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক ও সরকারি ক্রয়-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য দায়িত্বশীল এআই ব্যবহার ও এআই গভর্ন্যান্স বিষয়ে প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে।
সামনে কী করতে হবে?
এআই এখন আর ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়; এটি ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। সঠিক প্রস্তুতি থাকলে এ প্রযুক্তি বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, নতুন শিল্প তৈরি করতে এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে প্রস্তুতিতে দেরি হলে রুটিনভিত্তিক কাজের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামো, গবেষণা এবং দেশীয় এআই সক্ষমতায় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
এআই বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের জন্য শুধু হুমকি নয়; সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারলে এটি অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগও হতে পারে।
অধিকার ডেস্কঃ 

























