
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগকারী এম এইচ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মমিনুর রহমান নিজেই এখন মামলার আসামি হয়েছেন। তিনি পদ্মা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে সেই দুর্নীতি আড়াল করতে কৌশলে ২০২৪ সালের ৭ মে উল্টো অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন দুদকে। তবে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মমিনুর রহমানের নিজের অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য-প্রমাণ।
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০২৪ সালে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মমিনুর রহমান দাবি করেছিলেন, পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই, তিনি কখনো ওই ব্যাংকে যাননি এবং কোনো ঋণও নেননি।
তবে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আমেনা বেগম দুদককে জানান, মমিনুর রহমান ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন এবং জামানত হিসেবে তাঁর মালিকানাধীন গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়ইপাড়া মৌজার ৭৫.৪৫ শতাংশ জমির দলিল ব্যাংকে জমা দিয়েছিলেন। এরপর দুদক ২০২৪ সালে গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে ওই দলিলের সার্টিফাইড কপি চাইলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা পাঠানো হয়। দুদক যাচাই করে দেখে, ব্যাংকে জমা দেওয়া দলিল ও সার্টিফাইড কপি হুবহু মিলে যায়।
২০১৭ সালে গাজীপুর সদরে সাব রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা এ এইচ মুজাহিদুল ইসলাম, যিনি বর্তমানে নোয়াখালী জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত, তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। তিনি জানান, ২০১৭ সালে মমিনুর রহমান তাঁর কক্ষে উপস্থিত হয়ে ৭৫.৪৫ শতাংশ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করিয়েছিলেন।
পদ্মা ব্যাংকে জামানত হিসেবে জমা দেওয়া ওই দলিলের সাক্ষী ও শনাক্তকারী ছিলেন মমিনুর রহমানের মামা তথা সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা মো. অজিত উল্লাহ। ঋণের ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার মধ্যে ৬০ লাখ টাকা অজিত উল্লাহর মালিকানাধীন রানা ব্রিকস লিমিটেডের নামে পদ্মা ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। বাকি ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পদ্মা ব্যাংকের গুলশান সাউথ অ্যাভিনিউ শাখা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা শাখা থেকে নগদে উত্তোলন করেন মমিনুর রহমান নিজেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৭ সালে জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সার্কুলারে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংকের সব ধরনের ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তৎকালীন ব্যাংকের এমডি ও সিইও আবদুল মোতালেব পাটওয়ারী তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই ঋণ অনুমোদন করেন। বর্তমানে সুদ-আসলে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার ওই ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকায়। ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৭ মে পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে এই অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা করেছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে পদ্মা ব্যাংকের ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আব্দুল মোতালেব পাটওয়ারীসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে গত রোববার মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। এরপর সোমবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা তথা দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে কমিশনের ঢাকা-১ কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার ১০ আসামি হলেন—পদ্মা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আব্দুল মোতালেব পাটওয়ারী, এম এইচ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মমিনুর রহমান, ব্যাংকের সাবেক ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আমেনা বেগম, গুলশান সাউথ অ্যাভিনিউ শাখার সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক (এসডিপি) জর্জ কর্নেলিয়াস গমেজ, সাবেক ক্রেডিট ইনচার্জ মো. রাসেল মিয়া, সাবেক ম্যানেজার অপারেশন (এফভিপি) এম আতিফ খালেদ, সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শামছুল হাসান ভূঞা, সাবেক ম্যানেজার (অপারেশন) মাহবুব আহমদ, সাবেক ক্রেডিট ইনচার্জ (অফিসার) মো. কাওসার হোসেন এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরের মো. অজিত উল্লাহ।
দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
অধিকার ডেস্কঃ 




















