
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তাঁদের জবানবন্দির পরও এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দেওয়া ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্যে কিছুটা অসামঞ্জস্যও দেখা গেছে। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। তবে মুখমণ্ডলে এসিড বা কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের কোনো প্রমাণ মেলেনি।
গত রোববার বিকেল ৫টার দিকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তাঁরা। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা তথা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দুজন নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাঁদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
তবে আদালতে তাঁরা ঠিক কী বলেছেন, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পুলিশ। ফলে তাঁদের স্বীকারোক্তির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সোমবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের শরীরে শ্বাসরোধের আলামত পাওয়া গেছে। মরদেহ কয়েক দিন পড়ে থাকার কারণে পচনের ফলে মুখমণ্ডলে বিকৃতি দেখা দিলেও মুখে এসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চোয়াল ভেঙে দেওয়ার বিষয়টিও ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়নি বলে জানান তিনি। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামতের জন্য বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
ফরেনসিক বিভাগের এই তথ্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, এর আগে মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়াকে কেন্দ্র করে এসিড বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন বলছে, এ ধরনের কোনো প্রমাণ মেলেনি।
স্বীকারোক্তির পরও তদন্ত নিয়ে বিক্ষোভ
দুই আসামির গ্রেপ্তার ও আদালতে স্বীকারোক্তির খবরের মধ্যেই সোমবার রংপুরে বিক্ষোভ করেছেন জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত দুজনকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হয়ে যেতে পারে না, বরং হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
গতকাল দুপুরে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধনের পর একটি শোক মিছিল বের করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে নগরীর কাচারিবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশগ্রহণ করেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশের দেওয়া হত্যার বর্ণনায় বেশ কিছু প্রশ্নের সদুত্তর নেই। বিশেষ করে বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কাটার বিষয়, চারজনকে হত্যার সময় আশপাশের কেউ কোনো শব্দ না শোনা এবং হত্যার পর ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখার বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবিতে প্রশাসনকে তিন দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তে অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে তাঁদের পক্ষ থেকে।
জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে একধরনের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করার দাবি জানান তিনি।
সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে মানুষের মনে নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটল, চারজনকে হত্যা করা হলো অথচ আশপাশের কেউ কিছু টের পেল না—এমন অনেক প্রশ্নের সদুত্তর না পেয়েই দুজনকে ধরে খুনের সঙ্গে জড়িত বলে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। মানববন্ধন থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানানো হয়।
এ সময় বক্তব্য রাখেন মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ, সদস্য বিজয় প্রসাদ তপু, রংপুর মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবির হোসেন আশরাফী, কবি মওদুদ আহমেদসহ অন্যান্য নেতারা।
চার চিতায় শেষ বিদায়
রোববার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি চারটি চিতায় তোলা হয় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশের মরদেহ। স্বজনদের কান্নায় সেখানে সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির।
গণপতি চক্রবর্তীর দুই বড় ভাই গোপাল চক্রবর্তী ও গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, তাঁদের ছোট ভাই গণপতি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন এবং কারও সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁকে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতে হলো। তাঁরা হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
অধিকার ডেস্কঃ 
























