
প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াতের চাহিদা মেটাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিজস্ব বাস রয়েছে মাত্র ৭টি। ফলে শিক্ষার্থীদের পরিবহন চাহিদা পূরণে ভাড়াকরা বাসের ওপরই মূলত নির্ভর করতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। শিক্ষার্থীদের জন্য চলাচলকারী মোট ১৪টি ডাবল ডেকার বাসের মধ্যে ১৩টিই ভাড়া করা। এতে একদিকে যেমন বাস সংকট তৈরি হয়েছে, তেমনি ভাড়ার বাসের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৯টি অনুষদের অধীন ৩৬টি বিভাগে বর্তমানে মোট ১৯ হাজার ৮৯৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে ছাত্র সংখ্যা ১২ হাজার ৩১২ এবং ছাত্রী সংখ্যা ৭ হাজার ৫৮৫ জন। এছাড়া শিক্ষক রয়েছেন ৪১৭ জন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৭৪২ জন। নতুন শিক্ষাবর্ষে আরও প্রায় ২ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী যুক্ত হওয়ায় পরিবহনের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে মোট ৬০টি বাস রয়েছে, যার মধ্যে ২৪টি নিজস্ব এবং ৩৬টি ভাড়াকরা। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য ৮টি এসি বাসসহ বিভিন্ন বাস বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি বরাদ্দকৃত নিজস্ব বাস রয়েছে ৬টি এবং একটি নিজস্ব ডাবল ডেকার। এর বিপরীতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য চলাচল করে ১৩টি ভাড়াকরা ডাবল ডেকার বাস।
ব্যস্ত সময়ের ট্রিপগুলোতে এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। সকাল ১০টা, ১১টা, বিকাল ৪টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার ট্রিপে শহরের শুরুর স্টপেজ থেকেই বাস পূর্ণ হয়ে যায়। এর ফলে পরবর্তী স্টপেজের অনেক শিক্ষার্থী বাসে উঠতেই পারেন না। জায়গা না পেয়ে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ দরজার পাশে, আবার কেউ ঝুঁকি নিয়ে ডাবল ডেকারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করেন।
শহর থেকে ক্যাম্পাসের প্রায় ২৪ কিলোমিটার পথ এভাবে চলাচল করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে বা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাড়াকরা বাসের চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগও। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার বটতৈল এলাকায় শিক্ষার্থীবাহী একটি ভাড়াকরা বাস সড়ক বিভাজকে ধাক্কা দিলে কয়েকজন শিক্ষার্থী সামান্য আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার পরপরই চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
আইন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, চালক সামনে থাকা একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সড়ক বিভাজকে ধাক্কা দেয়, যাতে কয়েকজন সামান্য আহত হন। বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলেও তাঁরা যথেষ্ট আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, ঘটনার পর চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী তোরাব বলেন, সকালের শিফটে বাধ্য হয়ে ডাবল ডেকারের সিঁড়িতে ঝুলে ক্লাসে যেতে হয়। ক্লাস শেষে ২০ মিনিট আগে পৌঁছেও সিট পাওয়া যায় না, ফলে অনেক সময় দাঁড়িয়ে বা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাস ও ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। ফলে পরিবহন ফি পরিশোধ করেও তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত নতুন বাস সংযোজন, ট্রিপ ও রুট বাড়ানো এবং ভাড়াকরা বাসের চালকদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, বর্তমানে আগের তুলনায় ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, কোনো নির্দিষ্ট ট্রিপে বাসের সংখ্যা বাড়াতে হলে অন্য কোনো সময়ের ট্রিপ কমাতে হবে। অফিসারদের সকালে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত গাড়ির কয়েকটি দিনের একটা সময় অলস অবস্থায় থাকে, সেগুলো দিয়ে ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে জানান তিনি। এ জন্য রুটভিত্তিক প্রকৃত চাহিদা যাচাই করে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, রাতের বেলায় ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া রুটে স্থানীয় বাসিন্দারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ব্যবহার করে থাকেন। পর্যাপ্ত জনবল ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বাসে ওঠার সময় সবার পরিচয়পত্র যাচাই করা সম্ভব হয় না, ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান তিনি।
নতুন বাস কেনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপাতত এর সম্ভাবনা নেই। তবে পুরোনো বাসগুলো নিলামে তোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে ফাইল অনুমোদন পেলে নতুন বাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং অর্থসংকটসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবহন সংকটের দ্রুত সমাধান বেশ কঠিন বলেও জানান তিনি।
মোহাম্মদ সাদ,ইবি প্রতিনিধিঃ 






















