ঢাকা ০৬:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
সাংবাদিকতা জেল-ফাঁসির পেশা নয়, নীতি-নৈতিকতাই মূল ভিত্তি- প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান চাঁপাইনবাবগঞ্জে অভিযানে পৌনে ৮ লাখ টাকার নিষিদ্ধ জাল ধ্বংস সরকারি স্থাপনা ভেঙে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অভিযোগ; প্রায় হাজার একর কৃষিজমি হুমকিতে হালুয়াঘাটে অবৈধ সিসা কারখানায় যৌথ হানা, ৭ জনের কারাদণ্ড ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর সাথী হত্যা মামলায় আসামি হৃদয়ের মৃত্যুদণ্ড কালকিনিতে ইয়াবাসহ সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার নলডাঙ্গায় মাদকসেবনের দায়ে এক মাসের কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানা অবৈধ স্বর্ণালংকার বন্ধকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতায় হ্যান্ডবিল বিতরণ পুলিশের সাপাহার সীমান্তে ভারতীয় নেশাজাতীয় ট্যাবলেটসহ মদ আটক দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে ৭.৬৭ শতাংশ
কালভার্টের মুখ বন্ধ করে আবাসন প্রকল্প!

সরকারি স্থাপনা ভেঙে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অভিযোগ; প্রায় হাজার একর কৃষিজমি হুমকিতে

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাউলি মৌজায় জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া ধানখেত।

সরকারি কালভার্টের রেলিং ভেঙে এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে আবাসন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের পাউলি মৌজায়। অভিযোগের পর থেকেই ওই এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে ধানখেত, গ্রামীণ সড়ক ও নিচু এলাকার বিভিন্ন অংশ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চারটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিজমি ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি কালভার্টের রেলিং ভেঙে এবং পানি চলাচলের মুখে মাটি ফেলে পথ সংকুচিত বা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে কৃষিজমি, সড়ক ও আশপাশের জনবসতি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা না হলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ বিঘা ধান লাগানো জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় এক হাজার একর কৃষিজমিতে আমন আবাদ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয় কৃষকদের।

৩০ বছরের পুরোনো কালভার্ট, বন্ধ পানি নিষ্কাশনের পথ

জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের পাউলি মৌজায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্যোগে রাজস্ব খাতের আওতায় পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।

কালভার্টটির দুই পাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, চারটি গ্রাম, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ওই এলাকার হাজারো মানুষ প্রতিদিন এ পথ ব্যবহার করেন। শিল্পাঞ্চলমুখী যানবাহনসহ ট্রাক, বাস, কাভার্ডভ্যান, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ভ্যান চলাচলেও সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য কালভার্টটি উত্তর পাশের একটি খাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ওই পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ফারুক ও আজিম নামে দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার সময় কৃষিজমি ভরাট করা হয়। একই সঙ্গে কালভার্টের রেলিং ভেঙে এবং পানি চলাচলের পথের আশপাশে মাটি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

পানির নিচে ধানখেত, শঙ্কায় কৃষক

স্থানীয় কৃষক নাহিদ হাসান অভিযোগ করে বলেন, কালভার্টের মুখে মাটি ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে কৃষিজমি ভরাট করে কালভার্টের রেলিং ভেঙে সেখানে আবাসন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকেই বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছে না।

তার ভাষায়, “প্রায় ২০০ বিঘা ধান লাগানো জমি পানির নিচে রয়েছে। দ্রুত পানি না নামলে ধানগাছ পচে যাবে। এতে কৃষকদের কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলতি মৌসুমের ধানই নয়, ভবিষ্যতের আমন চাষও হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষিজমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলে মাটির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া, বীজতলা নষ্ট হওয়া এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হুমকিতে চার গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা

জলাবদ্ধতার কারণে মহাসড়কের সঙ্গে চারটি গ্রামের সংযোগ সড়কও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, পানি বাড়তে থাকলে স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

পাউলি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এ সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। এছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় মানুষের চলাচলের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি নিষ্কাশনের দ্রুত ব্যবস্থা না করা হলে রাস্তার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কয়েকটি গ্রামের মানুষ কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

‘আমাদের দেখার কেউ নেই’—কৃষকের আর্তি

স্থানীয় কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষিজমি ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়ে গেছি। প্রায় ২০০ বিঘা ধানিজমি পানির নিচে রয়েছে। এবার ফলন পাওয়া নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি ডুবে যাওয়ায় আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।”

আরেক কৃষক শরিফ বলেন, তার জমিতে পানি জমে থাকায় কৃষিজমি ছাড়াও আমগাছ ও অন্যান্য গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমনের বীজতলাও নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষায়, “জমিতে পানি থাকায় এখন আমি চরম দুশ্চিন্তায় আছি। ফসল নষ্ট হলে আমার মতো অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়বেন।”

কৃষিজমি ভরাট করে আবাসন ব্যবসার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বিঘা আবাদি জমি ভরাট করে সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার কাজ চলছে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষিজমি ভরাট করে প্লট তৈরি করে বসতবাড়ির জন্য বিক্রির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

তবে কৃষিজমি ভরাট, সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং পানি নিষ্কাশনের পথ পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি আবাসন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা, পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা, সরকারি সম্পত্তি এবং জনদুর্ভোগের বিষয়ও জড়িয়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে জলাবদ্ধতার চিত্র

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহাসড়কসংলগ্ন ওই এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কালভার্টের পাশের বিভিন্ন অংশে মাটি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসন প্রকল্পের নিচ দিয়ে পানি চলাচলের জন্য একটি ছোট ড্রেন নির্মাণ করা হলেও তা এলাকার বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

এদিকে কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় কৃষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না নামলে বিস্তীর্ণ এলাকার ধানখেত নষ্ট হয়ে যাবে।

অভিযুক্তের দাবি—‘ড্রেন নির্মাণ করেছি’

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ফারুক হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, জলাবদ্ধতা এড়াতে তার আবাসন প্রকল্পের নিচ দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে সরকারি কালভার্টের রেলিং ভাঙার বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন মহলকে অবহিত করেই তিনি কাজ করেছেন।

তার এ বক্তব্যের সত্যতা এবং কাজটির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সওজ বলছে—সরকারি স্থাপনা ভাঙা সম্পূর্ণ বেআইনি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিনুর রহমান বলেন, সড়কের কালভার্টের রেলিং ভেঙে, কালভার্টের মুখ বন্ধ করে এবং কৃষিজমি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ গুরুতর।

তিনি বলেন, “সরকারি সড়কের কালভার্টের রেলিং ভেঙে রাস্তার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তার বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি স্থাপনা ভাঙার ঘটনা যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এতদিন কীভাবে প্রকাশ্যে ওই কাজ চলল এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসিল্যান্ডকে দায়িত্ব

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, কালভার্টের রেলিং ভেঙে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে।

তিনি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

শুধু তদন্ত নয়, চাই দ্রুত পানি নিষ্কাশন

স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, তদন্তের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তদন্ত শেষ হতে সময় লাগলেও মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ধানগাছের জন্য প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের প্রশ্ন, সরকারি কালভার্টের পানি চলাচলের পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে, তবে সেই কর্মকাণ্ডের দায় কার? আর কয়েকশ কৃষকের ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সরকারি কালভার্টের ক্ষতি, পানি নিষ্কাশনের পথ, কৃষিজমি ভরাট এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো পৃথকভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কারণ কৃষকের ফসল একবার পচে গেলে, তদন্তের রিপোর্ট দিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের তদন্তে কী উঠে আসে এবং সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করে পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিকতা জেল-ফাঁসির পেশা নয়, নীতি-নৈতিকতাই মূল ভিত্তি- প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান

কালভার্টের মুখ বন্ধ করে আবাসন প্রকল্প!

সরকারি স্থাপনা ভেঙে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অভিযোগ; প্রায় হাজার একর কৃষিজমি হুমকিতে

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৩২:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারি কালভার্টের রেলিং ভেঙে এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে আবাসন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের পাউলি মৌজায়। অভিযোগের পর থেকেই ওই এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে ধানখেত, গ্রামীণ সড়ক ও নিচু এলাকার বিভিন্ন অংশ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চারটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিজমি ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি কালভার্টের রেলিং ভেঙে এবং পানি চলাচলের মুখে মাটি ফেলে পথ সংকুচিত বা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে কৃষিজমি, সড়ক ও আশপাশের জনবসতি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা না হলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ বিঘা ধান লাগানো জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় এক হাজার একর কৃষিজমিতে আমন আবাদ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয় কৃষকদের।

৩০ বছরের পুরোনো কালভার্ট, বন্ধ পানি নিষ্কাশনের পথ

জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের পাউলি মৌজায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্যোগে রাজস্ব খাতের আওতায় পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।

কালভার্টটির দুই পাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, চারটি গ্রাম, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ওই এলাকার হাজারো মানুষ প্রতিদিন এ পথ ব্যবহার করেন। শিল্পাঞ্চলমুখী যানবাহনসহ ট্রাক, বাস, কাভার্ডভ্যান, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ভ্যান চলাচলেও সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য কালভার্টটি উত্তর পাশের একটি খাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ওই পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ফারুক ও আজিম নামে দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার সময় কৃষিজমি ভরাট করা হয়। একই সঙ্গে কালভার্টের রেলিং ভেঙে এবং পানি চলাচলের পথের আশপাশে মাটি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

পানির নিচে ধানখেত, শঙ্কায় কৃষক

স্থানীয় কৃষক নাহিদ হাসান অভিযোগ করে বলেন, কালভার্টের মুখে মাটি ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে কৃষিজমি ভরাট করে কালভার্টের রেলিং ভেঙে সেখানে আবাসন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকেই বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছে না।

তার ভাষায়, “প্রায় ২০০ বিঘা ধান লাগানো জমি পানির নিচে রয়েছে। দ্রুত পানি না নামলে ধানগাছ পচে যাবে। এতে কৃষকদের কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলতি মৌসুমের ধানই নয়, ভবিষ্যতের আমন চাষও হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষিজমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলে মাটির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া, বীজতলা নষ্ট হওয়া এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হুমকিতে চার গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা

জলাবদ্ধতার কারণে মহাসড়কের সঙ্গে চারটি গ্রামের সংযোগ সড়কও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, পানি বাড়তে থাকলে স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

পাউলি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এ সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। এছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় মানুষের চলাচলের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি নিষ্কাশনের দ্রুত ব্যবস্থা না করা হলে রাস্তার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কয়েকটি গ্রামের মানুষ কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

‘আমাদের দেখার কেউ নেই’—কৃষকের আর্তি

স্থানীয় কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষিজমি ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়ে গেছি। প্রায় ২০০ বিঘা ধানিজমি পানির নিচে রয়েছে। এবার ফলন পাওয়া নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি ডুবে যাওয়ায় আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।”

আরেক কৃষক শরিফ বলেন, তার জমিতে পানি জমে থাকায় কৃষিজমি ছাড়াও আমগাছ ও অন্যান্য গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমনের বীজতলাও নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষায়, “জমিতে পানি থাকায় এখন আমি চরম দুশ্চিন্তায় আছি। ফসল নষ্ট হলে আমার মতো অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়বেন।”

কৃষিজমি ভরাট করে আবাসন ব্যবসার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বিঘা আবাদি জমি ভরাট করে সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার কাজ চলছে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষিজমি ভরাট করে প্লট তৈরি করে বসতবাড়ির জন্য বিক্রির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

তবে কৃষিজমি ভরাট, সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং পানি নিষ্কাশনের পথ পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি আবাসন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা, পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা, সরকারি সম্পত্তি এবং জনদুর্ভোগের বিষয়ও জড়িয়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে জলাবদ্ধতার চিত্র

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহাসড়কসংলগ্ন ওই এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কালভার্টের পাশের বিভিন্ন অংশে মাটি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসন প্রকল্পের নিচ দিয়ে পানি চলাচলের জন্য একটি ছোট ড্রেন নির্মাণ করা হলেও তা এলাকার বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

এদিকে কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় কৃষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না নামলে বিস্তীর্ণ এলাকার ধানখেত নষ্ট হয়ে যাবে।

অভিযুক্তের দাবি—‘ড্রেন নির্মাণ করেছি’

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ফারুক হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, জলাবদ্ধতা এড়াতে তার আবাসন প্রকল্পের নিচ দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে সরকারি কালভার্টের রেলিং ভাঙার বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন মহলকে অবহিত করেই তিনি কাজ করেছেন।

তার এ বক্তব্যের সত্যতা এবং কাজটির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সওজ বলছে—সরকারি স্থাপনা ভাঙা সম্পূর্ণ বেআইনি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিনুর রহমান বলেন, সড়কের কালভার্টের রেলিং ভেঙে, কালভার্টের মুখ বন্ধ করে এবং কৃষিজমি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ গুরুতর।

তিনি বলেন, “সরকারি সড়কের কালভার্টের রেলিং ভেঙে রাস্তার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তার বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি স্থাপনা ভাঙার ঘটনা যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এতদিন কীভাবে প্রকাশ্যে ওই কাজ চলল এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসিল্যান্ডকে দায়িত্ব

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, কালভার্টের রেলিং ভেঙে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে।

তিনি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউএনও বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

শুধু তদন্ত নয়, চাই দ্রুত পানি নিষ্কাশন

স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, তদন্তের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তদন্ত শেষ হতে সময় লাগলেও মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ধানগাছের জন্য প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের প্রশ্ন, সরকারি কালভার্টের পানি চলাচলের পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে, তবে সেই কর্মকাণ্ডের দায় কার? আর কয়েকশ কৃষকের ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সরকারি কালভার্টের ক্ষতি, পানি নিষ্কাশনের পথ, কৃষিজমি ভরাট এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো পৃথকভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কারণ কৃষকের ফসল একবার পচে গেলে, তদন্তের রিপোর্ট দিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের তদন্তে কী উঠে আসে এবং সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করে পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।