
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বসতি ও ফসলি জমির কাছাকাছি এলাকায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত একটি অবৈধ সিসা তৈরির কারখানায় যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর সিসা, সিসা তৈরির কাঁচামাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে সিসা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সাতজনকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ভোর ৫টার দিকে হালুয়াঘাট উপজেলার স্বদেশী ইউনিয়নের বাউশি ফিশারিজ সংলগ্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
র্যাব-১৪, হালুয়াঘাট উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই কারখানায় আকস্মিক অভিযান চালায়।
বসতি ও ফসলি জমির পাশে ‘বিষের কারখানা’
অভিযানকারী সূত্র জানায়, কারখানাটিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত ব্যাটারি পুড়িয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পদ্ধতিতে সিসা উৎপাদন করা হচ্ছিল। ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বর্জ্য আশপাশের পরিবেশ, মাটি, পানি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসা একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ভারী ধাতু। অনিয়ন্ত্রিতভাবে সিসা উৎপাদন ও ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ক্ষতিকর কণাগুলো মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলে শিশু, গর্ভবতী নারী ও শ্রমিকসহ মানুষের স্বাস্থ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়ভাবে এ ধরনের কারখানা বসতি ও কৃষিজমির আশপাশে পরিচালিত হলে শুধু শ্রমিকরাই নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষ এবং কৃষিজমিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিষাক্ত বর্জ্য মাটিতে মিশে গেলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যশৃঙ্খলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে পরিবেশবিদরা বিভিন্ন সময় সতর্ক করে আসছেন।
হাতেনাতে আটক ৭ জন
অভিযান চলাকালে কারখানায় সিসা উৎপাদনের কাজে জড়িত সাতজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—শরীয়তপুরের সখিপুরের আব্দুর রহিম (২৪), ঢাকার সাভারের আব্দুল মান্নান (৪৮), গাইবান্ধার সাঘাটার মঞ্জুরুল ইসলাম (২৪), নাটোরের গুরুদাসপুরের মেহেদী হাসান (২২), গাইবান্ধার সাঘাটার আনারুল ইসলাম (৪০), মশিউর (২৮) ও শিপন (২০)।
জব্দ বিপুল পরিমাণ সিসা ও সরঞ্জাম
অভিযান শেষে অবৈধ কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত সিসা, সিসা তৈরির কাঁচামাল এবং উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, এ ধরনের অবৈধ সিসা কারখানা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ব্যবহৃত ব্যাটারি পোড়ানোর সময় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাস দূষিত করার পাশাপাশি ক্ষতিকর বর্জ্য আশপাশের মাটি ও জলাশয়কে দূষিত করতে পারে।
মালিকরা পালালেও আইনি ব্যবস্থা চলমান
অভিযানের সময় কারখানার স্বত্বাধিকারী বা মূল উদ্যোক্তারা কৌশলে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে র্যাব। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, লাভের আশায় পরিবেশবিধ্বংসী ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা গড়ে তুলে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে পরিচালিত যেকোনো কারখানার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
র্যাব-১৪, ময়মনসিংহ জানিয়েছে, পরিবেশ ধ্বংসকারী, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং আইনবহির্ভূতভাবে পরিচালিত এ ধরনের অবৈধ সিসা কারখানার বিরুদ্ধে তাদের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে কারখানা বন্ধ করাই নয়—এ ধরনের অবৈধ শিল্পের নেপথ্যের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ ও কৃষিজমির সম্ভাব্য দূষণ তদন্ত করা জরুরি। তা না হলে বন্ধের পরও অন্যত্র আবারও গড়ে উঠতে পারে এমন ‘বিষের কারখানা’।
শফিয়েল আলম সুমন, ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 
























