ঢাকা ০৬:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
সাংবাদিকতা জেল-ফাঁসির পেশা নয়, নীতি-নৈতিকতাই মূল ভিত্তি- প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান চাঁপাইনবাবগঞ্জে অভিযানে পৌনে ৮ লাখ টাকার নিষিদ্ধ জাল ধ্বংস সরকারি স্থাপনা ভেঙে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অভিযোগ; প্রায় হাজার একর কৃষিজমি হুমকিতে হালুয়াঘাটে অবৈধ সিসা কারখানায় যৌথ হানা, ৭ জনের কারাদণ্ড ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর সাথী হত্যা মামলায় আসামি হৃদয়ের মৃত্যুদণ্ড কালকিনিতে ইয়াবাসহ সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার নলডাঙ্গায় মাদকসেবনের দায়ে এক মাসের কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানা অবৈধ স্বর্ণালংকার বন্ধকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতায় হ্যান্ডবিল বিতরণ পুলিশের সাপাহার সীমান্তে ভারতীয় নেশাজাতীয় ট্যাবলেটসহ মদ আটক দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে ৭.৬৭ শতাংশ

সাংবাদিকতা জেল-ফাঁসির পেশা নয়, নীতি-নৈতিকতাই মূল ভিত্তি- প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম।

সাংবাদিকতা কোনো জেল-ফাঁসির পেশা নয়; এটি একটি মহৎ, গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। তবে এই পেশার স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগের পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যও যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নীতি-নৈতিকতা, পেশাদারত্ব, দায়িত্ববোধ ও বস্তুনিষ্ঠতা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আয়োজনে এবং জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ‘গণমাধ্যমে অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ শীর্ষক এ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান বলেন, সাংবাদিকতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। সাংবাদিকতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িত।

তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি বড় দায়িত্ব। সাংবাদিকরা প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট বা পেশাগত অসদাচরণ করলে জেল-ফাঁসি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই প্রফেশনটা জেল-ফাঁসি দেওয়ার জন্য নয়। এখানে মূল বিষয়টিই হলো নীতি-নৈতিকতা বা এথিকস।”

সংবিধানে মৌলিক অধিকার এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম বলেন, দেশের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।

তিনি বলেন, সংবিধানে শুধু সাংবাদিক বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি; বরং ‘সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা’র কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের প্রতিটি শব্দই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাংবাদিকদের এসব বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

তার মতে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অপরিহার্য, তেমনি সেই স্বাধীনতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি বলেন, “একজন সাংবাদিকের সংবাদ পরিবেশনের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তার কিছু কর্তব্যও রয়েছে। শুধু অধিকার চাইব, আর কর্তব্য পালন করব না—এমনটি হতে পারে না।”

‘সাংবাদিকদের আইন জানতে হবে’

প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান বলেন, দেশে প্রায় দুই হাজার আইন রয়েছে এবং প্রতিটি আইনের বিভিন্ন বিধিবিধান রয়েছে। সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষেরই আইন সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন হলেও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি।

কারণ সাংবাদিকদের প্রতিদিন বিভিন্ন আইন, প্রশাসন, আদালত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশের আগে আইনগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এমন কোনো সংবাদ পরিবেশন করা উচিত নয়, যাতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে একই সঙ্গে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সত্য তথ্য অনুসন্ধান ও বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

২৫টি আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান

সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত আচরণবিধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম বলেন, সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত ২৫টি আচরণবিধি রয়েছে। পেশার মর্যাদা ও জনআস্থা ধরে রাখতে এসব আচরণবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিকতার প্রশ্নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

গণমাধ্যমে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও আইনি জ্ঞান বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রেস কাউন্সিলের কাঠামো ও বিচার প্রক্রিয়ার বাস্তবতা

প্রেস কাউন্সিলের প্রশাসনিক কাঠামো ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।

তিনি জানান, সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যমের মালিক, বাংলা একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বার কাউন্সিল এবং জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রেস কাউন্সিলের সদস্য কাঠামো গঠিত।

তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাউন্সিলের কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এককভাবে চেয়ারম্যান কোনো রায় দিতে পারেন না।

তার মতে, গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রম আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

সাংবাদিকতার বিভিন্ন আইন নিয়ে আলোচনা

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তব্য, দণ্ডবিধিতে সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধারা, প্রকাশনা আইন, ট্রেড ইউনিয়ন, তথ্য অধিকার আইন, প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রমসহ সাংবাদিকতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

কর্মশালায় রিসোর্স পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সচিব এবং সরকারের যুগ্ম সচিব মো. আব্দুস সবুর।

তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনগত সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার, অনলাইনভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ এবং দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতায় সাংবাদিকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কর্মশালায় উঠে আসে।

অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মান জরুরি

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের গতি বেড়েছে। তবে দ্রুততার প্রতিযোগিতায় ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশের ঝুঁকিও বেড়েছে।

এ অবস্থায় অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে।

বক্তারা মনে করেন, একটি ভুল বা যাচাইবিহীন সংবাদ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানভিত্তিক সাংবাদিকতা সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং আইনের সীমারেখা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে কর্মশালা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) একরামুল হক এবং জেলা তথ্য অফিসার রূপ কুমার বর্মন।

কর্মশালায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক চাঁপাই দর্পণের প্রকাশক ও সম্পাদক এবং চ্যানেল আইয়ের জেলা প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম রঞ্জু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি গোলাম মোস্তফা মন্টু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি হোসেন শাহনেওয়াজ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রফিকুল আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী।

দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রায় ৪০ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালায় সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশন, পেশাগত নৈতিকতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই, আইনগত বিষয় এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিয়ে ধারণা দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা এবং একই সঙ্গে পেশাগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে অপপ্রচার, গুজব, ভুয়া তথ্য ও অপসাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের নৈতিকতা, পেশাদারত্ব ও আইনি জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন।

প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের বক্তব্যের মূল বার্তাই ছিল স্পষ্ট—সাংবাদিকতার স্বাধীনতা থাকবে, তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে থাকতে হবে দায়িত্ববোধ; অধিকার থাকবে, তবে পালন করতে হবে কর্তব্য; আর পেশার মর্যাদা ধরে রাখতে নীতি-নৈতিকতার কোনো বিকল্প নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিকতা জেল-ফাঁসির পেশা নয়, নীতি-নৈতিকতাই মূল ভিত্তি- প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান

সাংবাদিকতা জেল-ফাঁসির পেশা নয়, নীতি-নৈতিকতাই মূল ভিত্তি- প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান

প্রকাশের সময়ঃ ০২:২৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংবাদিকতা কোনো জেল-ফাঁসির পেশা নয়; এটি একটি মহৎ, গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। তবে এই পেশার স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগের পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যও যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নীতি-নৈতিকতা, পেশাদারত্ব, দায়িত্ববোধ ও বস্তুনিষ্ঠতা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আয়োজনে এবং জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ‘গণমাধ্যমে অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ শীর্ষক এ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান বলেন, সাংবাদিকতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। সাংবাদিকতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িত।

তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি বড় দায়িত্ব। সাংবাদিকরা প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট বা পেশাগত অসদাচরণ করলে জেল-ফাঁসি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই প্রফেশনটা জেল-ফাঁসি দেওয়ার জন্য নয়। এখানে মূল বিষয়টিই হলো নীতি-নৈতিকতা বা এথিকস।”

সংবিধানে মৌলিক অধিকার এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম বলেন, দেশের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।

তিনি বলেন, সংবিধানে শুধু সাংবাদিক বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি; বরং ‘সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা’র কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের প্রতিটি শব্দই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাংবাদিকদের এসব বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

তার মতে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অপরিহার্য, তেমনি সেই স্বাধীনতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি বলেন, “একজন সাংবাদিকের সংবাদ পরিবেশনের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তার কিছু কর্তব্যও রয়েছে। শুধু অধিকার চাইব, আর কর্তব্য পালন করব না—এমনটি হতে পারে না।”

‘সাংবাদিকদের আইন জানতে হবে’

প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান বলেন, দেশে প্রায় দুই হাজার আইন রয়েছে এবং প্রতিটি আইনের বিভিন্ন বিধিবিধান রয়েছে। সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষেরই আইন সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন হলেও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি।

কারণ সাংবাদিকদের প্রতিদিন বিভিন্ন আইন, প্রশাসন, আদালত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশের আগে আইনগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এমন কোনো সংবাদ পরিবেশন করা উচিত নয়, যাতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে একই সঙ্গে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সত্য তথ্য অনুসন্ধান ও বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

২৫টি আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান

সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত আচরণবিধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম বলেন, সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত ২৫টি আচরণবিধি রয়েছে। পেশার মর্যাদা ও জনআস্থা ধরে রাখতে এসব আচরণবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিকতার প্রশ্নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

গণমাধ্যমে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও আইনি জ্ঞান বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রেস কাউন্সিলের কাঠামো ও বিচার প্রক্রিয়ার বাস্তবতা

প্রেস কাউন্সিলের প্রশাসনিক কাঠামো ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।

তিনি জানান, সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যমের মালিক, বাংলা একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বার কাউন্সিল এবং জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রেস কাউন্সিলের সদস্য কাঠামো গঠিত।

তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাউন্সিলের কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এককভাবে চেয়ারম্যান কোনো রায় দিতে পারেন না।

তার মতে, গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রম আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

সাংবাদিকতার বিভিন্ন আইন নিয়ে আলোচনা

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তব্য, দণ্ডবিধিতে সাংবাদিকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধারা, প্রকাশনা আইন, ট্রেড ইউনিয়ন, তথ্য অধিকার আইন, প্রেস কাউন্সিলের কার্যক্রমসহ সাংবাদিকতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

কর্মশালায় রিসোর্স পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সচিব এবং সরকারের যুগ্ম সচিব মো. আব্দুস সবুর।

তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনগত সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার, অনলাইনভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ এবং দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতায় সাংবাদিকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কর্মশালায় উঠে আসে।

অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মান জরুরি

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের গতি বেড়েছে। তবে দ্রুততার প্রতিযোগিতায় ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশের ঝুঁকিও বেড়েছে।

এ অবস্থায় অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে সাংবাদিকদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে।

বক্তারা মনে করেন, একটি ভুল বা যাচাইবিহীন সংবাদ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানভিত্তিক সাংবাদিকতা সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং আইনের সীমারেখা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে কর্মশালা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) একরামুল হক এবং জেলা তথ্য অফিসার রূপ কুমার বর্মন।

কর্মশালায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক চাঁপাই দর্পণের প্রকাশক ও সম্পাদক এবং চ্যানেল আইয়ের জেলা প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম রঞ্জু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি গোলাম মোস্তফা মন্টু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি হোসেন শাহনেওয়াজ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রফিকুল আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী।

দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রায় ৪০ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালায় সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশন, পেশাগত নৈতিকতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই, আইনগত বিষয় এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিয়ে ধারণা দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা এবং একই সঙ্গে পেশাগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে অপপ্রচার, গুজব, ভুয়া তথ্য ও অপসাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের নৈতিকতা, পেশাদারত্ব ও আইনি জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন।

প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের বক্তব্যের মূল বার্তাই ছিল স্পষ্ট—সাংবাদিকতার স্বাধীনতা থাকবে, তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে থাকতে হবে দায়িত্ববোধ; অধিকার থাকবে, তবে পালন করতে হবে কর্তব্য; আর পেশার মর্যাদা ধরে রাখতে নীতি-নৈতিকতার কোনো বিকল্প নেই।