ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ তাহসিফ হত্যা মামলা: দীপকে ফের ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ শেখ হাসিনা বেঁচে থাকা পর্যন্ত অস্থিতিশীলতার চেষ্টা চলবে: তথ্য উপদেষ্টা ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ: বিজ্ঞানমন্ত্রী মজুরি কমিশন গঠন হয়েছে, এখন আন্দোলনের সুযোগ নেই: প্রতিমন্ত্রী টুকু মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে অরাজকতার চেষ্টা, রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ডিএনসিসি প্রশাসকের শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি, সতর্ক বিএনপি নেতাকর্মীরাও মিরপুর-১১-তে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, যান চলাচল স্বাভাবিক; আটক ৪ এইচএসসিতে শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে, শাস্তির মুখে শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানপ্রধান গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১

নারী কার কাছে নিরাপদ

দেশে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, বাড়ছে নির্যাতনের পরিসংখ্যান (প্রতীকী ছবি)

আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পথে এগোলেও দেশে নারীর নিরাপত্তা এখন গভীর সংকটের মুখে। ঘরে, পথে, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর নিরাপত্তাহীনতার চিত্র বারবার সামনে আসছে। পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় নারী নির্যাতনের একের পর এক খবর জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

নারী সমাজের প্রাণশক্তি। ভয়হীন ও নিরাপদ পরিবেশ পেলেই তিনি মেধা ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন। নিরাপদ সমাজে নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে পারেন, যা শক্তিশালী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ নারীকেই প্রতিদিন কটূক্তি, অশালীন মন্তব্য, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, যৌতুক ও নানা ধরনের নিপীড়নের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। কখনো এসব ঘটছে অপরিচিতদের দ্বারা, কখনো আবার পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু বা সহপাঠীদের মাধ্যমেও।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৫৩টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। দলগত ধর্ষণ ১৪২ থেকে বেড়ে ১৭১টি হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ২৯ জন, আগের বছর যা ছিল ২৩। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৮১ জন, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯৪।

বছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ২০ হাজার ৬৯১টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ হাজার ৩২৫টি বেশি। মাসভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে এপ্রিল মাসে (২ হাজার ৮৯টি), আর সবচেয়ে কম জানুয়ারিতে (১ হাজার ৪৪০টি)।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নারী নির্যাতনসংক্রান্ত ২৬ হাজার ৩১৭টি ফোন পেয়েছে। এর মধ্যে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে এসেছে ১৪ হাজার ৯২৮টি কল। ২০২৪ সালে মোট কল ছিল ২৩ হাজার ৩৩টি, যার মধ্যে স্বামীর নির্যাতনসংক্রান্ত ১১ হাজার ৪১৮টি। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয়, নারীরা অনেক সময় প্রিয়জনদের কাছেও নিরাপদ নন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, আগের বছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৪২৭টি, এ বছর একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। স্বামীর হাতে নারী হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৫৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ৩১টি, ধর্ষণ ৩৫টি, যৌন হয়রানি ২টি এবং কন্যাবিবাহ ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতা ৬টি। এ ছাড়া যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনাও রয়েছে।

১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা ও অমানবিক কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে রাজপথে নামেন। এরপর ১৯০৯ সালে নিউ ইয়র্কে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন।

নারীর ভোটাধিকারের জন্য ইউরোপে স্যাফ্রোজেটদের আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন নারী মুক্তির ধারাকে বেগবান করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ম ও সামাজিক প্রথার নামে নারীকে বাল্যবিবাহ, সতীদাহ ও পর্দাপ্রথার মতো নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’তে সেই বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নবাব ফয়জুননেসা, বেগম রোকেয়া, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামালের মতো ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় নারীর জন্য ধীরে ধীরে সুযোগের পথ খুলেছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের একশ বছরের বেশি সময় পরও বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বিভিন্ন দেশে নারী নানা রূপে সহিংসতা, বৈষম্য, বাল্যবিবাহ ও অধিকারহীনতার শিকার হচ্ছেন।

গবেষকদের মতে, সামাজিক লজ্জা, আর্থিক অক্ষমতা ও পুলিশের প্রাথমিক অনীহার কারণে বেশির ভাগ পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। ফলে অনেক ঘটনা চাপা পড়ে যায়। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় প্রকৃত অপরাধীরা অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে বলেও মত বিশ্লেষকদের।

পারিবারিক সহিংসতা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধ। নারী দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী। তাঁদের দমিয়ে রাখা মানে সমাজ ও রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেওয়া। তাই সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ

নারী কার কাছে নিরাপদ

প্রকাশের সময়ঃ ০৩:৫৯:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পথে এগোলেও দেশে নারীর নিরাপত্তা এখন গভীর সংকটের মুখে। ঘরে, পথে, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর নিরাপত্তাহীনতার চিত্র বারবার সামনে আসছে। পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় নারী নির্যাতনের একের পর এক খবর জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

নারী সমাজের প্রাণশক্তি। ভয়হীন ও নিরাপদ পরিবেশ পেলেই তিনি মেধা ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন। নিরাপদ সমাজে নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে পারেন, যা শক্তিশালী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ নারীকেই প্রতিদিন কটূক্তি, অশালীন মন্তব্য, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, যৌতুক ও নানা ধরনের নিপীড়নের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। কখনো এসব ঘটছে অপরিচিতদের দ্বারা, কখনো আবার পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু বা সহপাঠীদের মাধ্যমেও।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৫৩টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। দলগত ধর্ষণ ১৪২ থেকে বেড়ে ১৭১টি হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ২৯ জন, আগের বছর যা ছিল ২৩। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৮১ জন, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯৪।

বছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ২০ হাজার ৬৯১টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ হাজার ৩২৫টি বেশি। মাসভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে এপ্রিল মাসে (২ হাজার ৮৯টি), আর সবচেয়ে কম জানুয়ারিতে (১ হাজার ৪৪০টি)।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নারী নির্যাতনসংক্রান্ত ২৬ হাজার ৩১৭টি ফোন পেয়েছে। এর মধ্যে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে এসেছে ১৪ হাজার ৯২৮টি কল। ২০২৪ সালে মোট কল ছিল ২৩ হাজার ৩৩টি, যার মধ্যে স্বামীর নির্যাতনসংক্রান্ত ১১ হাজার ৪১৮টি। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয়, নারীরা অনেক সময় প্রিয়জনদের কাছেও নিরাপদ নন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, আগের বছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৪২৭টি, এ বছর একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। স্বামীর হাতে নারী হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৫৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ৩১টি, ধর্ষণ ৩৫টি, যৌন হয়রানি ২টি এবং কন্যাবিবাহ ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতা ৬টি। এ ছাড়া যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনাও রয়েছে।

১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা ও অমানবিক কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে রাজপথে নামেন। এরপর ১৯০৯ সালে নিউ ইয়র্কে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন।

নারীর ভোটাধিকারের জন্য ইউরোপে স্যাফ্রোজেটদের আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন নারী মুক্তির ধারাকে বেগবান করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ম ও সামাজিক প্রথার নামে নারীকে বাল্যবিবাহ, সতীদাহ ও পর্দাপ্রথার মতো নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’তে সেই বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নবাব ফয়জুননেসা, বেগম রোকেয়া, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামালের মতো ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় নারীর জন্য ধীরে ধীরে সুযোগের পথ খুলেছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের একশ বছরের বেশি সময় পরও বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বিভিন্ন দেশে নারী নানা রূপে সহিংসতা, বৈষম্য, বাল্যবিবাহ ও অধিকারহীনতার শিকার হচ্ছেন।

গবেষকদের মতে, সামাজিক লজ্জা, আর্থিক অক্ষমতা ও পুলিশের প্রাথমিক অনীহার কারণে বেশির ভাগ পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। ফলে অনেক ঘটনা চাপা পড়ে যায়। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় প্রকৃত অপরাধীরা অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে বলেও মত বিশ্লেষকদের।

পারিবারিক সহিংসতা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধ। নারী দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী। তাঁদের দমিয়ে রাখা মানে সমাজ ও রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেওয়া। তাই সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে প্রতিটি নারী মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন।