ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ: বিজ্ঞানমন্ত্রী মজুরি কমিশন গঠন হয়েছে, এখন আন্দোলনের সুযোগ নেই: প্রতিমন্ত্রী টুকু মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে অরাজকতার চেষ্টা, রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ডিএনসিসি প্রশাসকের শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি, সতর্ক বিএনপি নেতাকর্মীরাও মিরপুর-১১-তে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, যান চলাচল স্বাভাবিক; আটক ৪ এইচএসসিতে শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে, শাস্তির মুখে শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানপ্রধান গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১ ডামুড্যায় গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ, স্বামী আটক হঠাৎ কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

স্ক্রিনে সংযুক্ত, বাস্তবে বিচ্ছিন্ন: স্মার্টফোনের যুগে সম্পর্কের নীরব সংকট

স্মার্টফোনে ডুবে থাকা মানুষ: একই ঘরে থেকেও কমছে মুখোমুখি কথোপকথন। (প্রতীকী ছবি)

সকালে ঘুম ভাঙে স্মার্টফোনের অ্যালার্মে, দিন শুরু হয় নোটিফিকেশন দিয়ে, আর রাত গড়ায় পর্দার আলোয়। একই ঘরে থেকেও মানুষ যেন আলাদা আলাদা জগতে বাস করছে। কারও আঙুল স্ক্রলে ব্যস্ত, কারও দৃষ্টি নতুন বার্তার অপেক্ষায়; অথচ পাশে বসা মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার ফুরসত নেই। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষের সঙ্গে দূরত্বও বাড়িয়েছে। এটিই আমাদের সময়ের এক নীরব বৈপরীত্য: স্ক্রিনে সংযুক্তি বাড়ছে, বাস্তব জীবনে সংযোগ কমছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি ও কর্মক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। প্রবাসী স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা কিংবা জরুরি মুহূর্তে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এখন সহজ। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে। যে মাধ্যমের কাজ যোগাযোগ সহজ করা, সেটিই যখন মানুষের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে, তখন সুবিধা রূপ নেয় সংকটে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের সংখ্যা কি একই হারে বাড়ছে? কারও ছবিতে প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ, কিন্তু তার মন খারাপের কারণ জানতে চাওয়া কঠিন। অভিনন্দন জানাতে একটি ইমোজিই যথেষ্ট, অথচ দুঃসময়ে পাশে বসে কথা বলার সময় বের করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনলাইনে উপস্থিত থাকা সহজ, কিন্তু সম্পর্কের দায় বহন করা কঠিন। সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক মনোযোগের ওপর; শুধু বার্তা বিনিময়ে এর বিকল্প তৈরি হয় না। ভার্চুয়াল জগতে মানুষ নিজের পছন্দমতো পরিচয় তুলে ধরতে পারে, কিন্তু বাস্তব সম্পর্ক দাবি করে দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও অকপট হওয়ার সাহস। ফলে পরিচিতির পরিধি বাড়লেও গভীর সম্পর্কের জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

পরিবার মানুষের সামাজিকীকরণের প্রথম প্রতিষ্ঠান। অথচ অনেক পরিবারে একসঙ্গে খেতে বসেও সবাই নিজের ফোনে মগ্ন। বাবা-মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সন্তান ভিডিও বা গেমে। কথাবার্তা সীমিত থাকে কেবল প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আর দৈনন্দিন কাজে। ফলে একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরের অনুভূতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার প্রবণতা বাড়ছে।

শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। অভিভাবক নিজে অবসরের প্রতিটি মুহূর্ত ফোনে কাটালে সন্তানকে স্ক্রিন ব্যবহারে সংযত হতে বলার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের আগে বড়দের নিজেদের অভ্যাস পর্যালোচনা করা জরুরি। পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার সংস্কৃতি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত জীবনের বাছাই করা, আকর্ষণীয় অংশটুকুই তুলে ধরা হয়। সাজানো ছবি, ভ্রমণ, সাফল্য আর আনন্দঘন মুহূর্ত দেখে অন্যের জীবনকে নিখুঁত মনে হতে পারে। নিজের বাস্তবতার সঙ্গে সেই প্রদর্শিত জীবনের তুলনা করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজের অর্জনকেও তুচ্ছ ভাবতে শুরু করেন।

কৈশোর ও তরুণ বয়সে এই প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কতজন ছবি পছন্দ করল, কতজন মন্তব্য করল কিংবা কে উত্তর দিল, এসবের ওপর নিজের মূল্য মাপার অভ্যাস আত্মবিশ্বাসকে অন্যের স্বীকৃতিনির্ভর করে তোলে। অথচ মানুষের মূল্য অনুসারীর সংখ্যা বা একটি পোস্টের জনপ্রিয়তায় নির্ধারিত হয় না। সততা, দায়িত্ববোধ, দক্ষতা ও সম্পর্কের গভীরতাই পরিচয়ের প্রকৃত ভিত্তি।

তবে অনলাইনে সক্রিয় থাকলেই কেউ একাকী, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও ভুল। ডিজিটাল মাধ্যম অনেকের জন্য বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার কার্যকর ক্ষেত্র। সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন অনলাইন উপস্থিতি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় কিংবা এর ব্যবহার দৈনন্দিন দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কথোপকথনে বাধা সৃষ্টি করে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অবিরাম স্ক্রল, ধারাবাহিক ভিডিও আর তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন ব্যবহারকারীর মনোযোগ আটকে রাখার সুযোগ তৈরি করে। দরকারি তথ্য খুঁজতে ফোন হাতে নিয়ে কখন আধা ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেকেই টের পান না। ক্ষতি শুধু সময়ের নয়; বারবার মনোযোগ ভাঙলে পড়াশোনা, কাজ ও সরাসরি কথোপকথনও ব্যাহত হতে পারে।

কেউ কথা বলার সময় বারবার ফোনের পর্দায় তাকালে অনেকে সেটিকে নিছক অভ্যাস ভাবেন। কিন্তু এতে সামনের মানুষটি অবহেলিত বোধ করতে পারেন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোযোগও এক ধরনের সম্মান। কারও পাশে বসে থাকা আর তাকে মন দিয়ে শোনা এক বিষয় নয়। উপস্থিতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তাতে মনও উপস্থিত থাকে।

এই সংকট মোকাবিলায় স্মার্টফোন বর্জন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি নয়। প্রয়োজন ব্যবহারে সংযম ও স্পষ্ট সীমারেখা। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা, ঘুমের আগে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং কথোপকথনের সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, এ ধরনের ছোট অভ্যাসই সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাশ তৈরি করতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল শিষ্টাচার, তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল আচরণ শেখানো দরকার। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝাতে হবে, প্রযুক্তি জীবনের সহায়ক, জীবনের বিকল্প নয়।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও একটি প্রশ্ন জরুরি: ফোন কি আমার প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি আমার সময় ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে? অনলাইন যোগাযোগ কি সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করছে, নাকি কাছের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে? এই আত্মজিজ্ঞাসাই সচেতন পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস কিংবা বিপুলসংখ্যক অনলাইন সংযোগ দিয়ে মাপা যায় না। দেখতে হবে, প্রযুক্তি আমাদের সম্পর্ক, চিন্তা ও সহমর্মিতাকে কতটা সমৃদ্ধ করছে। হাজারো অনলাইন সংযোগের ভিড়েও কঠিন সময়ে একটি আন্তরিক প্রশ্ন, মনোযোগ দিয়ে শোনা কয়েকটি কথা কিংবা নীরবে পাশে থাকা একজন মানুষই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারেন।

আমাদের প্রয়োজন শুধু সংযুক্ত থাকার প্রযুক্তি নয়, একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার মানসিকতাও। স্ক্রিনের ওপারের মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু হাতের নাগালে থাকা মানুষটিকে উপেক্ষা করে নয়। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করুক, বিচ্ছিন্ন নয়। এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ: বিজ্ঞানমন্ত্রী

স্ক্রিনে সংযুক্ত, বাস্তবে বিচ্ছিন্ন: স্মার্টফোনের যুগে সম্পর্কের নীরব সংকট

প্রকাশের সময়ঃ ০৩:২০:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

সকালে ঘুম ভাঙে স্মার্টফোনের অ্যালার্মে, দিন শুরু হয় নোটিফিকেশন দিয়ে, আর রাত গড়ায় পর্দার আলোয়। একই ঘরে থেকেও মানুষ যেন আলাদা আলাদা জগতে বাস করছে। কারও আঙুল স্ক্রলে ব্যস্ত, কারও দৃষ্টি নতুন বার্তার অপেক্ষায়; অথচ পাশে বসা মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার ফুরসত নেই। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষের সঙ্গে দূরত্বও বাড়িয়েছে। এটিই আমাদের সময়ের এক নীরব বৈপরীত্য: স্ক্রিনে সংযুক্তি বাড়ছে, বাস্তব জীবনে সংযোগ কমছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি ও কর্মক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। প্রবাসী স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা কিংবা জরুরি মুহূর্তে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এখন সহজ। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে। যে মাধ্যমের কাজ যোগাযোগ সহজ করা, সেটিই যখন মানুষের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে, তখন সুবিধা রূপ নেয় সংকটে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের সংখ্যা কি একই হারে বাড়ছে? কারও ছবিতে প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ, কিন্তু তার মন খারাপের কারণ জানতে চাওয়া কঠিন। অভিনন্দন জানাতে একটি ইমোজিই যথেষ্ট, অথচ দুঃসময়ে পাশে বসে কথা বলার সময় বের করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনলাইনে উপস্থিত থাকা সহজ, কিন্তু সম্পর্কের দায় বহন করা কঠিন। সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক মনোযোগের ওপর; শুধু বার্তা বিনিময়ে এর বিকল্প তৈরি হয় না। ভার্চুয়াল জগতে মানুষ নিজের পছন্দমতো পরিচয় তুলে ধরতে পারে, কিন্তু বাস্তব সম্পর্ক দাবি করে দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও অকপট হওয়ার সাহস। ফলে পরিচিতির পরিধি বাড়লেও গভীর সম্পর্কের জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

পরিবার মানুষের সামাজিকীকরণের প্রথম প্রতিষ্ঠান। অথচ অনেক পরিবারে একসঙ্গে খেতে বসেও সবাই নিজের ফোনে মগ্ন। বাবা-মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সন্তান ভিডিও বা গেমে। কথাবার্তা সীমিত থাকে কেবল প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আর দৈনন্দিন কাজে। ফলে একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরের অনুভূতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার প্রবণতা বাড়ছে।

শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। অভিভাবক নিজে অবসরের প্রতিটি মুহূর্ত ফোনে কাটালে সন্তানকে স্ক্রিন ব্যবহারে সংযত হতে বলার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের আগে বড়দের নিজেদের অভ্যাস পর্যালোচনা করা জরুরি। পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার সংস্কৃতি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত জীবনের বাছাই করা, আকর্ষণীয় অংশটুকুই তুলে ধরা হয়। সাজানো ছবি, ভ্রমণ, সাফল্য আর আনন্দঘন মুহূর্ত দেখে অন্যের জীবনকে নিখুঁত মনে হতে পারে। নিজের বাস্তবতার সঙ্গে সেই প্রদর্শিত জীবনের তুলনা করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজের অর্জনকেও তুচ্ছ ভাবতে শুরু করেন।

কৈশোর ও তরুণ বয়সে এই প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কতজন ছবি পছন্দ করল, কতজন মন্তব্য করল কিংবা কে উত্তর দিল, এসবের ওপর নিজের মূল্য মাপার অভ্যাস আত্মবিশ্বাসকে অন্যের স্বীকৃতিনির্ভর করে তোলে। অথচ মানুষের মূল্য অনুসারীর সংখ্যা বা একটি পোস্টের জনপ্রিয়তায় নির্ধারিত হয় না। সততা, দায়িত্ববোধ, দক্ষতা ও সম্পর্কের গভীরতাই পরিচয়ের প্রকৃত ভিত্তি।

তবে অনলাইনে সক্রিয় থাকলেই কেউ একাকী, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও ভুল। ডিজিটাল মাধ্যম অনেকের জন্য বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার কার্যকর ক্ষেত্র। সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন অনলাইন উপস্থিতি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় কিংবা এর ব্যবহার দৈনন্দিন দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কথোপকথনে বাধা সৃষ্টি করে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অবিরাম স্ক্রল, ধারাবাহিক ভিডিও আর তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন ব্যবহারকারীর মনোযোগ আটকে রাখার সুযোগ তৈরি করে। দরকারি তথ্য খুঁজতে ফোন হাতে নিয়ে কখন আধা ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেকেই টের পান না। ক্ষতি শুধু সময়ের নয়; বারবার মনোযোগ ভাঙলে পড়াশোনা, কাজ ও সরাসরি কথোপকথনও ব্যাহত হতে পারে।

কেউ কথা বলার সময় বারবার ফোনের পর্দায় তাকালে অনেকে সেটিকে নিছক অভ্যাস ভাবেন। কিন্তু এতে সামনের মানুষটি অবহেলিত বোধ করতে পারেন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোযোগও এক ধরনের সম্মান। কারও পাশে বসে থাকা আর তাকে মন দিয়ে শোনা এক বিষয় নয়। উপস্থিতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তাতে মনও উপস্থিত থাকে।

এই সংকট মোকাবিলায় স্মার্টফোন বর্জন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি নয়। প্রয়োজন ব্যবহারে সংযম ও স্পষ্ট সীমারেখা। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা, ঘুমের আগে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং কথোপকথনের সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, এ ধরনের ছোট অভ্যাসই সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাশ তৈরি করতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল শিষ্টাচার, তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল আচরণ শেখানো দরকার। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝাতে হবে, প্রযুক্তি জীবনের সহায়ক, জীবনের বিকল্প নয়।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও একটি প্রশ্ন জরুরি: ফোন কি আমার প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি আমার সময় ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে? অনলাইন যোগাযোগ কি সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করছে, নাকি কাছের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে? এই আত্মজিজ্ঞাসাই সচেতন পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস কিংবা বিপুলসংখ্যক অনলাইন সংযোগ দিয়ে মাপা যায় না। দেখতে হবে, প্রযুক্তি আমাদের সম্পর্ক, চিন্তা ও সহমর্মিতাকে কতটা সমৃদ্ধ করছে। হাজারো অনলাইন সংযোগের ভিড়েও কঠিন সময়ে একটি আন্তরিক প্রশ্ন, মনোযোগ দিয়ে শোনা কয়েকটি কথা কিংবা নীরবে পাশে থাকা একজন মানুষই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারেন।

আমাদের প্রয়োজন শুধু সংযুক্ত থাকার প্রযুক্তি নয়, একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার মানসিকতাও। স্ক্রিনের ওপারের মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু হাতের নাগালে থাকা মানুষটিকে উপেক্ষা করে নয়। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করুক, বিচ্ছিন্ন নয়। এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।