ঢাকা ১০:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
সাংবাদিক হেনস্তা: প্রশ্ন করাই কি অপরাধ? জাতীয় স্নাতক গণিত অলিম্পিয়াডের দিনাজপুর অঞ্চলে সেরা ১০-এ বেরোবির ৫ শিক্ষার্থী শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মহিলাদলের সভা আয়োজন, বাগাতিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির দুঃখ প্রকাশ ব্রহ্মপুত্র খননে ধীরগতি, বালু উত্তোলন ও দখল বন্ধের দাবিতে ময়মনসিংহে বিক্ষোভ সমাবেশ বাগাতিপাড়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মহিলাদলের মতবিনিময় সভা পাইকারি বাজারে আবারও বাড়ল চালের দাম, ৫০ কেজির বস্তায় বৃদ্ধি ২৫–৪০ টাকা ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল: প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে সিলেটের হাসপাতালে ভর্তি প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রাজশাহী মহানগর জামায়াতের নতুন আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের শপথ গ্রহণ রাজধানীতে চলন্ত বাসে আগুন, খিলগাঁওয়ে ককটেল বিস্ফোরণ

জাতীয় ঐক্য ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র সম্ভব নয়: সেমিনারে বক্তারা

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০৭:৪৮:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • ১২৪৫ Time View

জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জাতীয় ঐক্য: ৭ নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদেরা।

জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেছেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) আয়োজিত ‘জাতীয় ঐক্য: ৭ নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক ফজল, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, ব্যারিস্টার সারোয়ার জাহান, মেজর (অব.) এইচ খান, ড. নাসিমুল গণি ও মেজর (অব.) আমিন আফসারীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বরকে ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের বয়ান তৈরি হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে গিয়ে সৈনিকেরা কর্নেল তাহেরকে বের করে এনেছিলেন—এ ধরনের বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতা বাংলাদেশে আর কেউ ছিলেন না। তিনি সৎ, সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে অনন্য ছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকেও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্ট, সাহসী ও দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন থাকার আহ্বান জানান সাবেক এই উপদেষ্টা।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় সংকট ও ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দিনটির তাৎপর্য বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ৭ নভেম্বরের অন্যতম শিক্ষা হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঘটনাই জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক সহযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

অধ্যাপক মাসুম আরও বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা জরুরি। ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ শুধু অতীত স্মরণ করা নয়; বরং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের তাগিদ

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ৭ নভেম্বরের সময় জাতীয় ঐক্যের একটি অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মেধাবী ও সাহসী তরুণদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। জুলাই সনদকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা না বাড়িয়ে রাষ্ট্র গঠনে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক ফজল বলেন, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিগত ধারণা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শুধু ঐক্যের কথা বললেই হবে না, মানুষের কল্যাণকে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বাস্তব কোনো সমাধানে এখনো পৌঁছানো যায়নি। তাঁর মতে, জিয়াউর রহমান সব মত ও পথের মানুষকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে জুলাই সনদ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া জাতির মুক্তি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্যারিস্টার সারোয়ার জাহান বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ বারবার স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়েছে। জাতি গঠনের সুযোগ এলেও দেশ বারবার পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফিরে গেছে। সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকাতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভাবার আহ্বান

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। জনগণ কার্যকর সংসদ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দেখতে চায়। কোনো জাতীয় চেতনা বা ঐতিহাসিক অর্জন একক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ৭ নভেম্বর ছিল জনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা যায় না। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব জনগণের জন্য ইনসাফ নিশ্চিত করা। কিন্তু মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, জুলাই সনদ প্রণয়নে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

ড. নাসিমুল গণি বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

মেজর (অব.) আমিন আফসারী বলেন, ঐক্য শুধু আহ্বান জানিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না; নিজেদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হয়। দেশে চাঁদাবাজি ও তোষামোদনির্ভর রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মেজর (অব.) এইচ খান বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতিকে একমত হতে হবে। রক্তপাত ও প্রতিশোধের ওপর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করাকে ঐক্যের অন্যতম পূর্বশর্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাতীয় ঐক্যের আহ্বান সভাপতির

সভাপতির বক্তব্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বিভক্তির প্রভাব থেকে জাতি এখনো পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে সব মত ও পথের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যেই সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিক হেনস্তা: প্রশ্ন করাই কি অপরাধ?

জাতীয় ঐক্য ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র সম্ভব নয়: সেমিনারে বক্তারা

প্রকাশের সময়ঃ ০৭:৪৮:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেছেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) আয়োজিত ‘জাতীয় ঐক্য: ৭ নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক ফজল, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, ব্যারিস্টার সারোয়ার জাহান, মেজর (অব.) এইচ খান, ড. নাসিমুল গণি ও মেজর (অব.) আমিন আফসারীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বরকে ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের বয়ান তৈরি হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে গিয়ে সৈনিকেরা কর্নেল তাহেরকে বের করে এনেছিলেন—এ ধরনের বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতা বাংলাদেশে আর কেউ ছিলেন না। তিনি সৎ, সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে অনন্য ছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকেও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্ট, সাহসী ও দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন থাকার আহ্বান জানান সাবেক এই উপদেষ্টা।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় সংকট ও ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দিনটির তাৎপর্য বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ৭ নভেম্বরের অন্যতম শিক্ষা হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঘটনাই জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক সহযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

অধ্যাপক মাসুম আরও বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা জরুরি। ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ শুধু অতীত স্মরণ করা নয়; বরং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের তাগিদ

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ৭ নভেম্বরের সময় জাতীয় ঐক্যের একটি অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মেধাবী ও সাহসী তরুণদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। জুলাই সনদকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা না বাড়িয়ে রাষ্ট্র গঠনে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক ফজল বলেন, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিগত ধারণা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শুধু ঐক্যের কথা বললেই হবে না, মানুষের কল্যাণকে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বাস্তব কোনো সমাধানে এখনো পৌঁছানো যায়নি। তাঁর মতে, জিয়াউর রহমান সব মত ও পথের মানুষকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে জুলাই সনদ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া জাতির মুক্তি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্যারিস্টার সারোয়ার জাহান বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ বারবার স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়েছে। জাতি গঠনের সুযোগ এলেও দেশ বারবার পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফিরে গেছে। সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকাতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভাবার আহ্বান

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ৭ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। জনগণ কার্যকর সংসদ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দেখতে চায়। কোনো জাতীয় চেতনা বা ঐতিহাসিক অর্জন একক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ৭ নভেম্বর ছিল জনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা যায় না। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব জনগণের জন্য ইনসাফ নিশ্চিত করা। কিন্তু মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, জুলাই সনদ প্রণয়নে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

ড. নাসিমুল গণি বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

মেজর (অব.) আমিন আফসারী বলেন, ঐক্য শুধু আহ্বান জানিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না; নিজেদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হয়। দেশে চাঁদাবাজি ও তোষামোদনির্ভর রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মেজর (অব.) এইচ খান বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতিকে একমত হতে হবে। রক্তপাত ও প্রতিশোধের ওপর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করাকে ঐক্যের অন্যতম পূর্বশর্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাতীয় ঐক্যের আহ্বান সভাপতির

সভাপতির বক্তব্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বিভক্তির প্রভাব থেকে জাতি এখনো পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে সব মত ও পথের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যেই সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।