
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যা, চিকিৎসাসেবা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে পৌর এলাকাকে ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে দি চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা থেকে ১৫ থেকে ২০ জন ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দল পাঠিয়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুরাতন বাজারস্থ চেম্বার ভবনের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি তুলে ধরেন তিনি। এ সময় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সামনে শহরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অপরিকল্পিতভাবে পড়ে থাকা উন্নয়নকাজ এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
চেম্বার সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক জীবন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাঁর দাবি, পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জানতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য নির্ভুলভাবে সংগ্রহ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সংবাদ সম্মেলনে চেম্বার সভাপতি বলেন, প্রায় দুই বছর আগে থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু সময়মতো কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া যাচ্ছে। কেউ হাসপাতালে, কেউ বেসরকারি ক্লিনিকে, আবার কেউ বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে শহরের সামগ্রিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিচার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে চেম্বারের সম্মানিত সদস্য ওবাইদুল আজিম বিংকুও রয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। একজন সদস্যকে হারানোর বেদনা থেকে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে জানান চেম্বার সভাপতি।
তিনি দাবি করেন, করোনা মহামারির সময়ের তুলনায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে শহরবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এ তুলনার পক্ষে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে কি উঠে আসছে প্রকৃত চিত্র?
ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সরকারি পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে চেম্বার। আব্দুল ওয়াহেদের দাবি, আক্রান্ত রোগীদের একটি বড় অংশ বাড়িতে থেকে কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর মতে, প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী সরকারি হাসপাতালের হিসাবের বাইরে থাকতে পারেন। ফলে সরকারি নথিতে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিফলিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত কোনো রোগীর সেখানে মৃত্যু হলে সেই তথ্য স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে সব সময় প্রতিফলিত হয় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ অবস্থায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি উঠেছে। এতে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত রোগী, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা এবং মৃত্যুর তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
তবে চেম্বারের উত্থাপিত ৮০ শতাংশ রোগীর হিসাব ও মৃত্যুর তথ্যের অসংগতির অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। সঠিক পরিস্থিতি নিরূপণে স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত বুলেটিনের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জনপ্রতিনিধিহীন পৌরসভা, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ঘাটতির অভিযোগ
শহরের পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সেবার বেহাল দশা নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন চেম্বার সভাপতি। তাঁর অভিযোগ, পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় নাগরিক সেবা ও জবাবদিহির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শহরের একাধিক স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু বাড়ির ভেতর পরিষ্কার রাখলেই চলে না। বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জমি, ড্রেন, খোলা জলাধার, বাজার ও জনসমাগমস্থলে জমে থাকা পানিও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয়। কারণ এডিস মশা অল্প পরিমাণ স্থির পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পৌরসভার নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশন, নির্মাণাধীন স্থাপনা পরিদর্শন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
৩০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ, খোলা খালেই মশার প্রজননের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি ছিল পৌর এলাকায় চলমান উন্নয়নকাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। চেম্বার সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদের দাবি, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চললেও যথাযথ তদারকির অভাবে কিছু এলাকায় খনন করা খাল ও নালা দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে থাকছে। কোথাও কোথাও এসব স্থানে পানি ও ময়লা জমে মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
উন্নয়নকাজের উদ্দেশ্য যেখানে জলাবদ্ধতা কমানো, পানি নিষ্কাশন সহজ করা এবং নাগরিক জীবনকে স্বস্তিদায়ক করা, সেখানে কাজের দীর্ঘসূত্রতা ও নির্মাণস্থলের অব্যবস্থাপনা উল্টো জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন তুলেছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি।
এ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ও তদারকি সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। যেসব স্থানে খননকাজ শেষ হয়েছে, সেখানে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা এবং যেখানে কাজ চলমান, সেখানে জমে থাকা পানি অপসারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থব্যয়, কাজের অগ্রগতি এবং খোলা খালগুলোতে এডিস মশার লার্ভা রয়েছে কি না, তা সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আজাইপুর বিল থেকে মহানন্দার পাড়—প্রজননস্থল ধ্বংসের দাবি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শহরের বিভিন্ন জলাধার ও আশপাশের অপরিচ্ছন্ন স্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। চেম্বার সভাপতির বক্তব্যে আজাইপুর বিল, বেলেপুকুর, বিদিরপুর এবং মহানন্দা নদীর পাড়সহ শহরের বিভিন্ন বিল, পুকুর ও নদীতীরবর্তী এলাকার নাম উল্লেখ করা হয়।
তাঁর অভিযোগ, এসব স্থানের কিছু অংশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা এবং পানি জমে থাকার কারণে মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতা ও লার্ভা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানোর দাবি জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু উড়ন্ত মশা মারার জন্য ধোঁয়া ছড়ানো যথেষ্ট নয়। মশার লার্ভা কোথায় জন্মাচ্ছে, তা শনাক্ত করে উৎসস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, ফুলের টবের নিচের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা, পানির ড্রাম এবং নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।
শহরের জলাধার ও নদীতীরবর্তী এলাকায় মশার প্রজনন হচ্ছে কি না, তা প্রমাণভিত্তিকভাবে শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঢাকায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর দাবি
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। সংবাদ সম্মেলনে দুটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়।
প্রথমত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকাকে ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে বিশেষ নজরদারি ও জরুরি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা থেকে ১৫ থেকে ২০ জন ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দল গঠন করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হবে।
চেম্বারের মতে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল পাঠানো হলে জটিল রোগীর চিকিৎসা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
তবে কোনো এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করার আগে আক্রান্তের হার, মৃত্যুহার, রোগের বিস্তৃতি, হাসপাতালের চাপ এবং মশার ঘনত্বের মতো প্রাসঙ্গিক তথ্য মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।
জেলা হাসপাতালে বাড়াতে হবে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের প্রস্তুতি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তরল ব্যবস্থাপনা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শুধু রোগীর জ্বর কমেছে কি না, তা বিবেচনা করলেই চলে না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তের প্লেটলেট ও হেমাটোক্রিটের পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল লক্ষণ চিকিৎসকের নির্দেশনায় পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী সময়েও কিছু রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে।
তাই হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীকে কখন ভর্তি করতে হবে, কখন উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাতে হবে এবং জরুরি অবস্থায় কীভাবে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে—এসব বিষয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
জেলা হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু থাকলে জটিল রোগীর চিকিৎসায় বিলম্ব কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে চেম্বারের ১২ দফা আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১২টি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—
১. ওয়ার্ডভিত্তিক ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি: পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে সর্বদলীয় প্রতিনিধি, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন।
২. উন্নয়নকাজ দ্রুত সম্পন্ন: পৌরসভার চলমান উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করা এবং খনন করা খাল, নালা ও আশপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রয়োজন অনুযায়ী ডাস্টবিন ও বর্জ্য ফেলার নির্ধারিত স্থান স্থাপন এবং নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ।
৪. জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি: ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো।
৫. বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার রাখা: মার্কেট, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং জমে থাকা পানি অপসারণ।
৬. এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস: ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র ও ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ।
৭. পানির পাত্র ঢেকে রাখা: বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা।
৮. ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ: সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংসে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা।
৯. জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ: জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
১০. গুজব প্রতিরোধ: ডেঙ্গু সম্পর্কে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়িয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলা।
১১. সচেতনতামূলক কার্যক্রম: ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো।
১২. সমন্বিত উদ্যোগ: প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌর কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমাজ, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন পরিচ্ছন্নতা অভিযান কিংবা সাময়িক মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় একদিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে পরে আবার ময়লা জমতে দিলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত পরিদর্শন, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, বর্জ্য অপসারণ এবং কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রকাশ করা জরুরি।
পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবন, মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি স্থাপনা ও পরিত্যক্ত জমিতে জমে থাকা পানির বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। যেখানে নিয়ম ভাঙার প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে নাগরিকদেরও নিজেদের বাড়ি, ছাদ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধকে কেবল প্রশাসনের কাজ মনে করলে চলবে না; এটি পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সমগ্র নগরবাসীর সম্মিলিত দায়িত্ব।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে চেম্বার সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী সমাজ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।
চেম্বারের দাবির মধ্য দিয়ে শহরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজের উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন প্রয়োজন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য প্রকাশ, চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরবাসীর প্রত্যাশা—ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদ্যোগ যেন কেবল সংবাদ সম্মেলন, আশ্বাস কিংবা সাময়িক পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহি ও সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে শহরকে নিরাপদ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 






















