
মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো নিজের প্রকৃত অবস্থান চিনতে শেখা। অন্যের ভুল খুঁজে বের করতে আমরা যতটা পারদর্শী, নিজের ভুল স্বীকার করতে ততটাই অনীহা প্রকাশ করি। সাফল্য, সম্পদ, জ্ঞান কিংবা পদমর্যাদা অর্জনের পর কেউ কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করেন। নিজের দুর্বলতা আড়াল করা, ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো এবং ভিন্নমতকে অবজ্ঞা করার এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে অহংকার। আর অহংকারের আড়ালেই জন্ম নেয় আত্মপ্রবঞ্চনা, যেখানে মানুষ নিজের কাছেই সত্য গোপন করে।
ইসলামে আত্মসম্মান ও অহংকার এক বিষয় নয়। আত্মসম্মান মানুষকে নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে শেখায়, আর অহংকার অন্যকে ছোট করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রবণতা তৈরি করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সুরা লুকমান, আয়াত ১৮)।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১এ)।এই শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, অহংকার শুধু সম্পদ বা বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সত্য সামনে আসার পরও তা মেনে না নেওয়া, নিজের ভুল স্বীকারে অনীহা এবং অন্যের মর্যাদা অস্বীকার করাও অহংকারের প্রকাশ। যে ব্যক্তি নিজেকে সব সময় সঠিক মনে করেন, তাঁর পক্ষে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবে আত্মোন্নয়নের পথ সংকুচিত হয়, আর আত্মপ্রশংসা হয়ে ওঠে আত্মতুষ্টির মাধ্যম।
আত্মপ্রবঞ্চনা হলো নিজের ভুল, দুর্বলতা কিংবা ব্যর্থতার বাস্তবতা এড়িয়ে নিজের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে প্রস্তুতির ঘাটতি স্বীকার না করে পরিস্থিতিকে দায়ী করা, সম্পর্কের অবনতিতে নিজের আচরণ পর্যালোচনা না করে অন্যকে দোষ দেওয়া কিংবা অন্যের সাফল্যকে খাটো করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এসব এর পরিচিত উদাহরণ।সাময়িকভাবে এসব আচরণ স্বস্তি দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা সংশোধনের পথ বন্ধ করে দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, অতএব, তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না – কে তাকওয়াবান, তা তিনি ভালো জানেন।(সুরা আন-নাজম, আয়াত ৩২)।অর্থাৎ নিজেকে নির্ভুল কিংবা অন্যের চেয়ে অধিক পবিত্র দাবি করাই প্রকৃত যোগ্যতার প্রমাণ নয়। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্য, জনপ্রিয়তা ও বাহ্যিক অর্জন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা আত্মপ্রবঞ্চনার প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। অনেকে জীবনের আনন্দ ও অর্জন তুলে ধরলেও ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা কিংবা নিজের সীমাবদ্ধতা আড়াল করেন। অন্যের সাজানো সাফল্যের সঙ্গে নিজের বাস্তবতার তুলনা করে কেউ হীনম্মন্যতায় ভোগেন, আবার কেউ নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নামেন।বিশেষত তরুণদের ক্ষেত্রে প্রশংসা, মন্তব্য ও অনুসারীর সংখ্যাকে আত্মমূল্যের মাপকাঠি বানানো আত্মপরিচয় গঠনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। অথচ ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য বাহ্যিক প্রদর্শনে নয়; চিন্তা, আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতায় প্রকাশিত হয়। মানুষের স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টায় নিজের নৈতিক উন্নতির কথা ভুলে যাওয়া আত্মপ্রবঞ্চনারই আরেক রূপ।
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামীকালের জন্য সে কী পাঠিয়েছে, তা চিন্তা করা।(সুরা আল-হাশর, আয়াত ১৮)।এই নির্দেশনা আত্মজিজ্ঞাসা ও কাজের পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে। প্রতিদিন নিজের আচরণ ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা, যুক্তিসংগত সমালোচনা গ্রহণ করা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং ভুল হলে ক্ষমা চেয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে আমার আত্মবিশ্বাস কি প্রকৃত যোগ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, নাকি অন্যের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিচালিত?পরিশেষে, অহংকার মানুষকে সাময়িক শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি দিলেও আত্মপ্রবঞ্চনা তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ইসলাম আত্মপ্রশংসার পরিবর্তে বিনয়, অন্যকে দোষারোপের পরিবর্তে আত্মসমালোচনা এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনের পরিবর্তে নৈতিক উৎকর্ষের শিক্ষা দেয়। প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নিজেকে নির্ভুল প্রমাণ করার মধ্যে নয়; বরং সত্যকে মেনে নেওয়া, নিজের ভুল সংশোধন করা এবং বিনয়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সাহসের মধ্যে। যে নিজের কাছে সৎ হতে শেখে, সে-ই নিজেকে চেনার পথে এগিয়ে যায়।
আফিয়া আলম, শিক্ষার্থী,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া 

























