
গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে ১২ মামলায় আসামি ৫ হাজার, তৌফিকের মৃত্যুতে মামলা হয়নি
২. বিস্তারিত নিউজ
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে ভাঙচুর ও নাশকতার অভিযোগে শিল্প পুলিশ ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে ১২টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭০ জনকে। তবে আন্দোলনের সময় ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনায় আরও কয়েকটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
নাশকতার অভিযোগে ১২ মামলা, গ্রেপ্তার ৭০
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২ গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আজাদ হোসাইন জানান, তাঁদের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত তিনটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪২ জনকে। তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই চলছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আগে থেকেই ৮ থেকে ১০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বাকি কারখানাগুলো চালু আছে।
অন্যদিকে, গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত নয়টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, নাশকতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আরও কয়েকটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুতে এখনো মামলা হয়নি
আন্দোলনের সময় একটি কারখানায় ভাঙচুরের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন ২১ বছর বয়সী শ্রমিক তৌফিক শেখ। তবে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
জয়দেবপুর থানার ওসি আল মামুন জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ দেননি। পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা করা হয়নি। তবে নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জিএমপি ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। তৌফিকের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনের সময় একটি কারখানায় ভাঙচুরের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন তৌফিক। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত তৌফিক শেখের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামে। তিনি তবি খাঁর ছেলে। বাবার মৃত্যুর পর পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে আসেন তৌফিক। এক বন্ধুর মাধ্যমে লায়লা গার্মেন্টসে চাকরি নেন। তিনি বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
নাশকতার ঘটনায় একাধিক মামলা হলেও তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে গাজীপুরে অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। তাঁদের ক্যামেরা ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। তাঁরা সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পোশাকশিল্পের কয়েকজন মালিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ‘গার্মেন্টস শ্রমিক গাজীপুর’ নামের ফেসবুক গ্রুপসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও গ্রুপ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শ্রমিকদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন মালিকপক্ষের
শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাদমা গ্রুপের পরিচালক এইচ এম শাকোত ইমরান।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং বেতন বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। শ্রমিকদের দাবির প্রতি তাঁরা শ্রদ্ধাশীল। সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধি রয়েছেন। বোর্ড সম্মিলিতভাবে যে মজুরি নির্ধারণ করবে, তাঁরা তা মেনে নেবেন।
শাকোত ইমরান বলেন, শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা কর্মবিরতির অধিকার রয়েছে। তবে ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, দোকানপাটে আগুন দেওয়া কিংবা যানবাহন ভাঙচুর শ্রমিকদের কাজ হতে পারে না। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, সাদমা গ্রুপের কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিলেও বাইরে থেকে ফোন আসার পর তাঁদের কেউ কেউ কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। অন্য কারখানার লোকজনের হামলা ও ভাঙচুরের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিক বাঁচলে আমি বাঁচব, শ্রমিক বাঁচলে আমার ফ্যাক্টরি বাঁচবে, আমার ফ্যাক্টরি বাঁচলে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল হবে।’
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কারখানার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন শাকোত ইমরান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ধৈর্য ধরে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অধিকার ডেস্কঃ 






















