একসময় সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করত। বিশেষ করে রেলস্টেশন, জিলা স্কুল মোড়, গাঙ্গীনাপাড়, পাটগুদাম ব্রিজ, আকুয়া, মাসকান্দা ও কালীবাড়ী রোডসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে যাতায়াতকারীরাও নিজেদের নিরাপদ মনে করতেন না।
নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত পরিচালিত সর্বশেষ যৌথ অভিযানে আরও ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে কয়েকদিনের অভিযানে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জনে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে, ডিবির ওসি (দক্ষিণ) মুহাম্মাদ মাহবুবুল হক এবং কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি মো. শিবিরুল ইসলামের নির্দেশনায় অভিযান পরিচালিত হয়। পাটগুদাম ব্রিজ, কালীবাড়ী রোড, রেলওয়ে স্টেশন মোড়, গাঙ্গীনাপাড়, আলীয়া মাদ্রাসা মোড় এবং হাজী কাশেম আলী কলেজ মাঠসহ বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালিয়ে এসব ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা রয়েছে। ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে সক্রিয় অপরাধী চক্রগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে পুলিশ।
এদিকে সাম্প্রতিক অভিযানে নগরবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভুক্তভোগী তাদের পূর্বের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন।
ভুক্তভোগী জিয়া রহমান জানান, জিলা স্কুল মোড় এলাকায় একসময় তাঁর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পর তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে একজন অচেনা ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি তাঁকে চিকিৎসা নিতে সহায়তা করেন এবং বাড়ি ফেরার ভাড়ার ব্যবস্থাও করে দেন।
শিক্ষার্থী সারোয়ার জাহান শুভ বলেন, অতীতে এমন ঘটনার শিকার হওয়ার পর থেকে তিনি প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন সঙ্গে বহন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম বাচ্চুর দাবি, জিলা স্কুল মোড় থেকে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এলাকায় দিনের বেলাতেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ সায়েম শফিক জয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্ট, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিয়মিত টহল এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের মতো আধুনিক উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত অভিযান ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা ও অন্ধকার সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চলমান বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, ধারাবাহিক এই উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হবে, যেখানে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ দিন-রাত নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবেন। কারণ নিরাপদ নগর গড়ে ওঠে শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেও।
শফিয়েল আলম সুমন,ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: 

























