ঢাকা ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনে যাত্রা শুরু জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের রাজপথের সংঘাতের প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না মায়ের উদ্দেশে শেষ চিঠি লিখেই আন্দোলনে যান আনাস জুলাই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর: ছয় মামলার রায় মালয়েশিয়ায় তিন বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার, সহকর্মী বাংলাদেশি গ্রেপ্তার ‘ছাত্রদলের মাস্তানি সহ্য করা হবে না’-সংবাদ সম্মেলনে শিবির সভাপতি নূরুল কলেজে এমপির স্ত্রীর সভাপতি নিয়োগ ৩ মাসের জন্য স্থগিত, হাইকোর্টের রুল জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় দীপু মনি, মায়াসহ ৩৭৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জুলাই যোদ্ধা আয়াসকে পেটালেন শান্তা ফারজানা সিডনির লেকাম্বা সড়ক দুর্ঘটনা: ৮ দিন পর প্রাণ হারালেন নুরহায়াতি-লাইফ সাপোর্টে বাংলাদেশি মাহবুবুল
জুলাই বিপ্লব

রাজপথের সংঘাতের প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না

  • অধিকার ডেস্ক:
  • প্রকাশের সময়ঃ ১১:২০:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ১২৩৪ Time View

জুলাই আন্দোলনের সময় আহতদের চিকিৎসা দিতে ব্যস্ত ছিলেন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথের সংঘাতের প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোও তখন পরিণত হয়েছিল চরম সংকটময় চিকিৎসাকেন্দ্রে। গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত মানুষের ঢল, জরুরি অস্ত্রোপচার, স্বজনদের উদ্বেগ আর চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতিটি দিন ছিল অত্যন্ত কঠিন।

প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক ও আহত ব্যক্তিদের বর্ণনায় জানা যায়, বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে আহতদের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। জরুরি বিভাগ, করিডোর ও ওয়ার্ডজুড়ে একের পর এক আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একই সঙ্গে নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করতে স্বজনদের ছোটাছুটিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আহতের শরীরে গুলি বা ছররা গুলির আঘাত ছিল। অনেকের চোখ, মুখ, বুক, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম দেখা যায়। অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

ঢামেক হাসপাতালের তৎকালীন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আবরার হামিম বলেন, ১৯ জুলাই রাতের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে আহতদের চিকিৎসা চলছিল, একই সঙ্গে একের পর এক মরদেহও আনা হচ্ছিল। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বিরামহীনভাবে অস্ত্রোপচার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা চালিয়ে বহু মানুষের জীবন রক্ষার চেষ্টা করেন।

ঢামেকের আইসিইউ চিকিৎসক ডা. আল কায়েস সরকার জানান, ১৮ জুলাইয়ের পর থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে বিশেষ রোস্টারের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, গুরুতর আহত অনেক রোগীকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। একই সময়ে অনেক রোগী নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণেও উদ্বেগে ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আহত রিকশাচালক নুরুল ইসলাম জানান, ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় আহত হওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি অসংখ্য আহত ও নিহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হতে দেখেছেন। সেই স্মৃতি এখনো তাকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়।

ঢামেকের এক নার্স জানান, আহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে অনেক রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছিল। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টানা দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সুমাইয়া আক্তার বলেন, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রোগীকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হয়েছে।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. যাকিয়া সুলতানা জানান, আন্দোলনের সময় চোখে আঘাত পাওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল নজিরবিহীন। হাসপাতালের একাধিক অপারেশন থিয়েটার একসঙ্গে চালু রেখে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করলেও সবার দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৮৬৪ জন আহত ভর্তি হন। এছাড়া প্রায় এক হাজার মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৫০ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়।

ফরাজী হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আন্দোলনের পুরো সময়ে সেখানে এক হাজারের বেশি আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। একইভাবে উত্তরা ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারেও শত শত আহত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

চিকিৎসকদের মতে, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি ব্যতিক্রমী সংকটকাল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আহতদের চিকিৎসা, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং সীমিত সম্পদ নিয়ে টানা দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এখনো তাদের মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনে যাত্রা শুরু জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের

জুলাই বিপ্লব

রাজপথের সংঘাতের প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না

প্রকাশের সময়ঃ ১১:২০:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথের সংঘাতের প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোও তখন পরিণত হয়েছিল চরম সংকটময় চিকিৎসাকেন্দ্রে। গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত মানুষের ঢল, জরুরি অস্ত্রোপচার, স্বজনদের উদ্বেগ আর চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতিটি দিন ছিল অত্যন্ত কঠিন।

প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক ও আহত ব্যক্তিদের বর্ণনায় জানা যায়, বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে আহতদের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। জরুরি বিভাগ, করিডোর ও ওয়ার্ডজুড়ে একের পর এক আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একই সঙ্গে নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করতে স্বজনদের ছোটাছুটিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আহতের শরীরে গুলি বা ছররা গুলির আঘাত ছিল। অনেকের চোখ, মুখ, বুক, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম দেখা যায়। অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

ঢামেক হাসপাতালের তৎকালীন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আবরার হামিম বলেন, ১৯ জুলাই রাতের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে আহতদের চিকিৎসা চলছিল, একই সঙ্গে একের পর এক মরদেহও আনা হচ্ছিল। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বিরামহীনভাবে অস্ত্রোপচার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা চালিয়ে বহু মানুষের জীবন রক্ষার চেষ্টা করেন।

ঢামেকের আইসিইউ চিকিৎসক ডা. আল কায়েস সরকার জানান, ১৮ জুলাইয়ের পর থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে বিশেষ রোস্টারের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, গুরুতর আহত অনেক রোগীকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। একই সময়ে অনেক রোগী নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণেও উদ্বেগে ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আহত রিকশাচালক নুরুল ইসলাম জানান, ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় আহত হওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি অসংখ্য আহত ও নিহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হতে দেখেছেন। সেই স্মৃতি এখনো তাকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়।

ঢামেকের এক নার্স জানান, আহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে অনেক রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছিল। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টানা দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সুমাইয়া আক্তার বলেন, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রোগীকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হয়েছে।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. যাকিয়া সুলতানা জানান, আন্দোলনের সময় চোখে আঘাত পাওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল নজিরবিহীন। হাসপাতালের একাধিক অপারেশন থিয়েটার একসঙ্গে চালু রেখে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করলেও সবার দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৮৬৪ জন আহত ভর্তি হন। এছাড়া প্রায় এক হাজার মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৫০ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়।

ফরাজী হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আন্দোলনের পুরো সময়ে সেখানে এক হাজারের বেশি আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। একইভাবে উত্তরা ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারেও শত শত আহত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

চিকিৎসকদের মতে, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি ব্যতিক্রমী সংকটকাল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আহতদের চিকিৎসা, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং সীমিত সম্পদ নিয়ে টানা দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এখনো তাদের মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে।