
দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘মিড-ডে মিলের রুটির মধ্যে ব্লেড’ পাওয়ার ঘটনায় অবশেষে সামনে এসেছে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, রুটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো ত্রুটি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তদন্তে উঠে এসেছে, প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিজেই ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল বলে স্বীকার করেছে।
এদিকে, অভিযোগটি যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্লেডসহ রুটির ছবি বিভিন্ন ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শারমিন জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার (৩০ জুলাই) দুপুরে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীমের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউএনও বলেন, দেশব্যাপী আলোচিত এই ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। তাই নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “সরকারের ভাবমূর্তি এবং জনগণের আস্থা রক্ষার স্বার্থে আমরা প্রতিটি তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করেছি। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।”
তদন্তের শুরুতেই রুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানায় সরেজমিন পরিদর্শন করে তদন্ত দল।
কারখানায় ময়দা মেশানো, ডো প্রস্তুত, বেকিং, কাটিং, প্যাকেজিংসহ পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে ব্লেড ব্যবহার করেও দেখা হয় সেটি উৎপাদন লাইনে অক্ষত অবস্থায় রুটির ভেতরে থাকতে পারে কি না।
তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে একটি আস্ত ব্লেড রুটির ভেতরে চলে আসার সম্ভাবনা প্রযুক্তিগতভাবে প্রায় অসম্ভব। কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এমন কোনো ধাতব বস্তু প্রবেশ করলে তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা।
কারখানায় কোনো অসঙ্গতি না পাওয়ার পর তদন্তের পরিধি বিদ্যালয়কেন্দ্রিক করা হয়।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশও যাচাই করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে তার বাড়িতে ব্যবহৃত ব্লেডের ধরন মিলিয়ে দেখা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্লেডও উদ্ধার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একপর্যায়ে প্রথম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী জানায়, ব্লেডটি আগে থেকেই তার স্কুলব্যাগে ছিল।
বিদ্যালয়ে ব্লেড নিয়ে আসা নিষিদ্ধ হওয়ায় শিক্ষক দেখে ফেললে বকাঝকা বা শাস্তির আশঙ্কায় সে ব্যাগ থেকে ব্লেডটি বের করে নিজের রুটির মধ্যে লুকিয়ে রাখে।
পরে রুটির প্যাকেট খোলার সময় পাশের শিক্ষার্থী জান্নাত ব্লেডটি দেখে শিক্ষককে জানিয়ে দিতে পারে—এই ভয়ে সে নিজেই আগে শ্রেণি শিক্ষকের কাছে গিয়ে দাবি করে, “রুটির মধ্যে ব্লেড পেয়েছি।”
তদন্ত কমিটির দাবি, এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের মিল পাওয়া গেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অভিযোগ পাওয়ার পর শ্রেণি শিক্ষিকা শারমিন জাহান ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই না করেই ব্লেডসহ রুটির ছবি তুলে শিক্ষকদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে পাঠিয়ে দেন।
পরবর্তীতে সেই ছবি বিভিন্ন শিক্ষক গ্রুপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সত্যতা যাচাইয়ের আগেই ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয় এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, সরকারি কর্মচারী হিসেবে কোনো তথ্য যাচাই না করে তা প্রচার করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
তিনি বলেন, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে শিক্ষিকা শারমিন জাহানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইল্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক শাহ আলম খান আগেই দাবি করেছিলেন, রুটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত হয়।
তার ভাষ্য, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধাতব বস্তু প্রবেশ করলে তা মিক্সিং ধাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা। ফলে একটি অক্ষত ব্লেড রুটির ভেতরে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
ইউএনও মো: ইব্রাহীম বলেন, তদন্ত কমিটি মাত্র তিন দিনের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।
তার দাবি, “এটি তথ্য-উপাত্তনির্ভর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন।”
উল্লেখ্য, গত ২২ জুলাই গৌরনদী পৌরসভার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা রুটির মধ্যে ব্লেড পাওয়ার দাবি করে প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী।
এরপর ব্লেডসহ রুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি দ্রুত দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে।
সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুরুতে প্রচারিত দাবির সঙ্গে ভিন্ন। ফলে বহুল আলোচিত এই ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে এবং প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সৈয়দ নুর আহসান,বরিশাল প্রতিনিধি: 






















