
“আমরা যেন জুলাইকে হারিয়ে না ফেলি। জুলাইয়ের চেতনাকে যেন আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে পারি। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি—এটাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে জাতির উদ্দেশে এমন আবেগঘন আহ্বান জানিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের (ভারপ্রাপ্ত) রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, জুলাই শুধু একটি তারিখ নয়, এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাই এই চেতনাকে রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে লালন করতে হবে।
বুধবার (৫ আগস্ট) বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী এবং আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে রাষ্ট্রপতি বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং তাদের অভিনন্দন জানান।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া।
‘জুলাই জাতির গৌরবময় ইতিহাস’
রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অসংখ্য মানুষ অক্লান্ত সংগ্রাম করেছেন। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ছাত্র-জনতা এবং সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। সেই ধারাবাহিক আত্মত্যাগের ফলেই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে এবং জাতির ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে একটি গৌরবময় অধ্যায়।
তিনি বলেন, “এই ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করবে। যারা জীবন দিয়েছেন, যারা নির্যাতন সহ্য করেছেন এবং যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের অবদান কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।”
অন্ধ তরুণকে দেখে আবেগাপ্লুত রাষ্ট্রপতি
বক্তব্যের একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি একটি হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এর আগে অনুষ্ঠিত আরেকটি অনুষ্ঠানে তিনি দেখেছেন—একজন মা তাঁর অন্ধ ছেলেকে হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে এসেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ওই তরুণ দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। সবার সামনে মা তাঁর পরিবারের দুঃখ, কষ্ট, অভাব ও বেদনার কথা তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “জুলাইয়ে যারা জীবন দিয়েছেন কিংবা অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জাতীয় সংসদ ও বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি দায়িত্ব নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার।”
তিনি সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
‘৫ আগস্টও জাতীয় বিজয়ের দিন’
সভাপতির বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর যেমন গৌরব ও বিজয়ের দিন, তেমনি ৫ আগস্টও ইতিহাসে গৌরব ও বিজয়ের দিন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
তিনি বলেন, “২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিদেশি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে অর্জন করেছি। আর ৫ আগস্ট অর্জিত হয়েছে দেশীয় ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাভূত করার মাধ্যমে।”
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পায়নি। ফলে জনগণ বহুবার স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য ধৈর্য, সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং পরিশীলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
‘সংস্কারের শুরু হতে হবে মানুষের মন থেকে’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রকৃত সংস্কার কেবল আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর সূচনা হতে হবে মানুষের চিন্তা ও মনোজগত থেকে।
তিনি বলেন, “মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন না হলে শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার ও মেরামতের সূচনা হতে হবে সংবিধান থেকে, কারণ সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।”
‘গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের পথ খুলেছে’
জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফসল। এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই দেশে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতার গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও সুসংহত করার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।”
তিনি জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, অতীত সরকারের সময় বাকস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেশের অর্থ পাচার, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকট উত্তরণে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
শিশু-কিশোরদের মধ্যে জুলাইয়ের ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে আয়োজিত রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের হুইপবৃন্দ, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শেষে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কেবল স্মরণে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বাস্তবায়িত হতে পারে। শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বানও জানানো হয়।
দৈনিক অধিকার ডেস্কঃ 





















