
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে রোববার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যরা ডনকে আটক করেন। পরে তাকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সালমান শাহ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে বিকেলে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডনকে আটক করে। পরে সিআইডির একটি দল তাকে নিয়ে যায়। সালমান শাহ হত্যা মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে।
আদালতে ডনকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে সিআইডি। আবেদনে বলা হয়, মামলার বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী ডনসহ অন্য আসামিরা পরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং ডন দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী ডনকে কারাগারে আটক রাখার পক্ষে শুনানি করেন। তবে আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
রোববার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে ডনকে আদালতে হাজির করা হয়। প্রথমে তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরানো এবং হাতকড়া অবস্থায় তাকে এজলাসে নেওয়া হয়। কাঠগড়ায় নেওয়ার পর এগুলো খুলে দেওয়া হয়।
শুনানির শুরুতে বিচারক জুয়েল রানা জানতে চান, আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী রয়েছেন কি না। প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়, ডনের পক্ষে কোনো আইনজীবী নেই।
পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী তাকে কারাগারে রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, মামলাটি বহুল আলোচিত এবং দীর্ঘ সময় পর একটি পর্যায়ে এসেছে। রোববার ভোরে ডন বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে দাবি করে তাকে ইমিগ্রেশন থেকে আটক করে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর হত্যা মামলা
চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ২৯ বছর পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা করা হয়। ওই দিন সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা নীলা চৌধুরীর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত।
মামলা হওয়ার পর আসামিদের দেশত্যাগ ঠেকাতে তাদের নামের তালিকা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। এরপর হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত শুরুর পর ডন গ্রেপ্তার হলেন।
ডন গ্রেপ্তারের পর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সালমান তাঁর বুকের মধ্যে ছিলেন এবং থাকবেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় ডন জড়িত ছিলেন। একই সঙ্গে ছেলের মৃত্যুর পর ডনের বিরুদ্ধে তাকে অপমান ও সালমানকে নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগও করেন তিনি। সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন নীলা চৌধুরী।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুকে ঝুলে শ্বাসরোধজনিত আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় সালমান শাহর বাবা প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন।
আদালত অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। তদন্তে রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ নামে এক আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।
তবে সিআইডির প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হয়ে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। একই সঙ্গে পুত্রবধূ সামিরা হক, চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবিসহ ১১ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন।
পরে মামলাটি র্যাবের কাছে তদন্তের জন্য দেওয়া হলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানায়। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ র্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এরপর আদালতের নির্দেশে ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে মামলার পুনঃতদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তিন বছরের বেশি সময় তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই জানায়, সালমান শাহকে হত্যার প্রমাণ তারা পায়নি। সংস্থাটি তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে এবং সালমান শাহর লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়ার কথাও জানায়।
তবে সালমান শাহর পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তাঁর মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আরও তদন্তের দাবি জানান।
২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত নীলা চৌধুরীর রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। বিভিন্ন কারণে পরবর্তী সময়ে শুনানি বিলম্বিত হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষ হয় এবং ২০ অক্টোবর আদেশের দিন ধার্য করা হয়।
সেদিন আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ফরহাদ।
মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর নিউ ইস্কাটনের বাসায় তাঁর মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও ছোট ভাই শাহরান শাহ গিয়েছিলেন। সেখানে সালমান ঘুমিয়ে আছেন বলে তাদের জানানো হয়। কিছুক্ষণ পর প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান।
পরে পরিবারের সদস্যরা বাসায় ফিরে সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে তদন্তাধীন। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম ও তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, তা এখন দেখার বিষয়।
অধিকার ডেস্কঃ 





















