
বাংলাদেশে একসময় তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ‘কুশ’ নামের মাদকের বিস্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, আকাশপথ ও স্থলসীমান্ত ব্যবহার করে দেশে কুশের বিভিন্ন চালান ঢুকছে। এর মধ্যে থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ডিএনসি সূত্র জানায়, গত এক মাসে থাইল্যান্ড থেকে আনা কুশের তিনটি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার এবং আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তে চক্রটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ডিএনসি ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী পরিচালক ড. আবু সাঈদ মিয়া জানান, বিশেষ জাতের গাঁজার ফুল প্রক্রিয়াজাত করে কুশ তৈরি করা হয়। সাধারণ গাঁজার তুলনায় এতে নেশা সৃষ্টিকারী উপাদানের মাত্রা বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, কুশ বিভিন্ন উপায়ে সেবনের পাশাপাশি কেক, চকলেট, চুইংগাম ও ভেপজাতীয় পণ্যের মাধ্যমেও বাজারজাত করা হচ্ছে।
থাইল্যান্ড-ভারত-বাংলাদেশের নাগরিকদের সম্পৃক্ততার তথ্য
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, থাইল্যান্ডের ব্যাংকককেন্দ্রিক কিছু মাদক কারবারির কাছ থেকে কুশ সংগ্রহ করে তা ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক যুক্ত রয়েছেন। বাংলাদেশি কয়েকজন তাদের সহযোগিতা করছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হোসেন আবদুল কাদের শেখ নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে ৩ কেজি কুশ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএনসি। তিনি কলকাতা হয়ে ব্যাংকক যান এবং সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার সময় চালানটি সঙ্গে আনেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে ১৮ আগস্ট বিমানবন্দরে ৪ কেজি ১০০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। ওই চালানটি ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পান্ডে এনেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। তবে জব্দের প্রক্রিয়া বুঝতে পেরে তারা বিমানবন্দর থেকে চলে যান। তাদের অবস্থান শনাক্তে কাজ চলছে।
এ ছাড়া গত ২৪ জুলাই জুলফিকার মোল্লা নামে একজনকে ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএনসি সূত্র বলছে, তিনি কলকাতার একটি বিমান সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। চাকরি হারানোর পর বিভিন্ন আর্থিক সমস্যায় পড়ে মাদক পরিবহনে যুক্ত হন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, জুলফিকারের সহযোগী হিসেবে তার চাচাতো ভাই আকরাম মোল্লার নাম এসেছে। তিনি কলকাতায় ডেকোরেটর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
দেশে কুশ ছড়ানোর কাজ করছে স্থানীয় সহযোগীরা
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক তিনটি চালানের সঙ্গে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তারা ঢাকায় চালান পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাওয়ার পর দেশের ভেতরে মাদকটি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ স্থানীয় সহযোগীরা করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে অবস্থানের ব্যবস্থা এবং আইনি সহায়তার ক্ষেত্রেও স্থানীয় সহযোগীরা ভূমিকা রাখছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ৬ আগস্ট সাতক্ষীরা সীমান্তে ১২ কেজি কুশসহ মো. তারিকুজ্জামান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি। ওই চালানটি ভারতমুখী ছিল বলে তখন বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যেও আসক্তির তথ্য
ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কুশ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সময় তারা এমন তথ্য পেয়েছেন।
গত ২৬ মে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক নারী চিকিৎসক ও তার ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে আটক করে ডিএনসি। তাদের কাছ থেকে ৫৯টি ইলেকট্রনিক ভেপ উদ্ধার করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, সেগুলোর মধ্যে কুশের প্রধান নেশাজাতীয় উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি) পাওয়া যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে ওই চিকিৎসক জানান, তার ছেলে ভেপ চেয়েছিল। সে কারণে বিদেশে গিয়ে এগুলো কেনা হয়েছিল বলে ডিএনসিকে জানান তিনি।
দেশে উৎপাদনেরও চেষ্টা
সংশ্লিষ্টরা জানান, কিছু দেশে কুশ বা গাঁজার চাষ নিষিদ্ধ হওয়ায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাইড্রোপনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগের সন্ধান মিলেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর ওয়ারীতে কুশ উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য একটি ল্যাবরেটরি শনাক্ত করা হয়। ডিএনসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবাসী তৌসিফ হাসান বিদেশ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে দেশে নিজের বাসায় এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে বাংলাদেশে প্রথমবার কুশ জব্দের তথ্য জানায় র্যাব। তখন ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদ নামে একজনের বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে ফিরে বিভিন্ন মাদক নিয়ে গবেষণা এবং উৎপাদনের জন্য ল্যাব তৈরির অভিযোগ ওঠে।
অধিকার ডেস্কঃ 























