
ময়মনসিংহে দিন দিন ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে মাদকের বিস্তার। সীমান্তপথ, আঞ্চলিক সড়ক ও বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে মাদক প্রবেশ ও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও উদ্ধারকৃত মাদকের তুলনায় মামলার সংখ্যা কম হওয়ায় একটি সমন্বয় সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য।
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে শুধু অভিযান পরিচালনাই নয়, বরং মাদক প্রবেশ ও বিক্রির রুট চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা এবং উপজেলা পর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অফিস স্থাপনের সুপারিশ করার কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত (এমপি)।
ময়মনসিংহ জেলার আইনশৃঙ্খলা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নসহ জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি সংক্রান্ত এই সমন্বয় সভায় বিষয়গুলো উঠে আসে। জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ (ময়মনসিংহ-৪), সংসদ সদস্য মো. জাকির হোসেন বাবলু, সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান, সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু ও সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন। এ ছাড়া ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান, সিভিল সার্জনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানরাও সভায় অংশ নেন।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬ মাসে ময়মনসিংহে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও মাদকবিরোধী সংস্থার পক্ষ থেকে মোট ১ হাজার ৭২২টি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৪৭ টাকা মূল্যের মাদক ও সংশ্লিষ্ট মালামাল উদ্ধার করা হলেও এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে মোট ২০১টি। এর মধ্যে বিজিবি ১ হাজার ২০টি অভিযানে প্রায় ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৭ টাকার মাদক উদ্ধার করে ৫২টি মামলা করেছে। পুলিশ ৩৮৭টি অভিযানে প্রায় ৩২ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টাকার মাদক উদ্ধার করে করেছে ১১২টি মামলা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ১২৮টি অভিযানে প্রায় ৯১ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকার মাদক উদ্ধার করলেও মামলা করেছে মাত্র ১১টি। আর র্যাব ১৮৭টি অভিযানে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকার মাদক উদ্ধার করে করেছে ২৬টি মামলা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ অভিযান ও মাদক উদ্ধারের তুলনায় মামলার সংখ্যা যথেষ্ট কম, যা সভায় জনপ্রতিনিধিদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য ময়মনসিংহে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিমত, শুধু মাদক উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, পরিবহনকারী ও বিক্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদক প্রবেশের সম্ভাব্য রুটগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা। তাঁদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানে তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতা, নিয়মিত অভিযান এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা দরকার।
র্যাব-১৪, ময়মনসিংহের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে গাঁজা, ইয়াবা, বিদেশি মদ, হেরোইন ও বিভিন্ন ট্যাবলেটসহ প্রায় ৫ লাখ ৫ হাজার ৬০০ টাকার মাদক উদ্ধার করে সংস্থাটি, যাতে ১৮ জন আটক ও ১২টি মামলা হয়। এর আগের জুন মাসে র্যাবের অভিযানে প্রায় ১৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকার মাদক উদ্ধার ও ৭ জন আটকের বিপরীতে মামলা হয়েছিল ৪টি।
জুলাই মাসে ডিবি ও থানা পুলিশের অভিযানে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইনজেকশন, ইয়াবা, দেশি-বিদেশি মদ ও গাঁজাসহ প্রায় ৩২ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টাকার মাদক উদ্ধার হয়, যাতে ১৭০ জন গ্রেপ্তার ও ১১২টি মামলা হয়। এর আগের জুন মাসে পুলিশের অভিযানে ১৬৯ জন গ্রেপ্তার ও ১১৮টি মামলা হয়েছিল, তখন উদ্ধারকৃত মাদকের মূল্য ছিল প্রায় ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ টাকা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জুলাই মাসের চিত্রও উদ্বেগজনক। এ মাসে গাঁজা, ইয়াবা, বিদেশি মদ, ফেনসিডিল, হেরোইন ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ প্রায় ৯১ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়, যাতে ৫০ জন আটক ও মোট ৪১টি মামলা হয়। এর মধ্যে মোবাইল কোর্টে নিষ্পত্তি হয় ৩০টি মামলা এবং নিয়মিত মামলা হয় ১১টি।
সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধেও অভিযান চালিয়েছে ৩৯ বিজিবি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় মদ ও সিরাপ উদ্ধার করে ৫টি মামলা করা হয়। এর আগের জুন মাসে ভারতীয় মদ ও গাঁজাসহ প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৭০০ টাকার মাদক উদ্ধার ও ৭টি মামলা করা হয়েছিল।
মাদক বিক্রি ও এর প্রবণতা রোধে নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সভায়। জুলাই মাসে ৬৯টি টাস্কফোর্স অভিযানের মাধ্যমে ৩৯টি মামলায় প্রায় ৩০ হাজার ৭৬০ টাকার অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মাদকবিরোধী মোবাইল কোর্ট অভিযান আরও বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে। জুলাই মাসে মাদকবিরোধী ৭৬টি অভিযানের মাধ্যমে ১৪০টি মামলায় ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয় এবং ১৪০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সভায় উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি হলো উপজেলা পর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অফিস স্থাপন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জানান, মাদকের ভয়াবহতা রোধে কার্যক্রম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে এই অফিস স্থাপনের সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি মাদক মামলায় সহজে জামিন না পাওয়ার বিষয়টি আইনমন্ত্রীকে অবহিত করার কথাও জানান তিনি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, উপজেলা পর্যায়ে সরাসরি মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
সমন্বয় সভায় আইনশৃঙ্খলা ও মাদক প্রসঙ্গের বাইরেও জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, এই সমস্যা একদিনে সমাধান সম্ভব নয়, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ছাড়া ময়মনসিংহে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনার কথাও সভায় জানানো হয়। কৃষিখাতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ময়মনসিংহে সার মজুদের গুদামঘর সংস্কারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
পরিবেশ ও জলাবদ্ধতা নিরসনেও বড় পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয় সভায়। আগামী পাঁচ বছরে জেলায় প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটারের জন্য চারটি সরকারি দপ্তর ইতিমধ্যে নিজেদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখনন এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
সভা শেষে মন্ত্রী দপ্তরপ্রধান ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সফল করাই এই সমন্বয় সভার মূল লক্ষ্য, যার জন্য প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
শফিয়েল আলম সুমন, ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 























