
ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে শুধু মশা নিধন নয়, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা অপসারণ এবং নাগরিকদের সচেতন করার লক্ষ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উপর রাজারামপুর ও সিসিডিবি এলাকায় এ কার্যক্রম চালায় পৌরসভার টিম-৪।
বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পরিচালিত এ অভিযানে বাড়ির আঙিনা, গলি, খোলা জায়গা, জলাধার ও আশপাশের পরিবেশ পরিদর্শন করা হয়। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি অপসারণের পাশাপাশি বাসিন্দাদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা হয়। কর্মসূচিতে রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসের সদস্যরাও অংশ নেন।
জমে থাকা পানি অপসারণে বিশেষ নজর
অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভাব ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্ত করা, পানি অপসারণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করাকে অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয়।
পরিদর্শনের সময় কয়েকটি জলাধারে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। পরে টিম-৪-এর সদস্যরা সেসব স্থান থেকে পানি অপসারণ করেন এবং জলাধার ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেন।
অভিযানসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিদর্শনের সময় জলাধারের আশপাশে কিছু মশা উড়তে দেখা গেলেও মশার লার্ভা পাওয়া যায়নি। তবে একবার পরিদর্শনে লার্ভা না পাওয়া গেলেও ভবিষ্যতে সেখানে মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি থাকবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শুধু মশা নিধন নয়, প্রজননস্থল নির্মূল জরুরি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, ফুলের টবের নিচের পাত্র, খোলা পানির পাত্র, পরিত্যক্ত বোতল, ক্যান, ডাবের খোসা কিংবা প্লাস্টিকের ফেলে রাখা সামগ্রীতে পানি জমে মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অভিযানে শুধু দৃশ্যমান আবর্জনা অপসারণ নয়, বরং কোথায় পানি জমছে এবং কোন স্থানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এ সময় ‘বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করি, করিব ডেঙ্গু প্রতিকার’ বার্তার মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বাসিন্দাদের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, বৃষ্টির পানি জমতে না দেওয়া এবং পানি ধরে রাখতে পারে এমন পরিত্যক্ত সামগ্রী সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানানো হয়।
বাড়ির ছাদ থেকে আঙিনা—সবখানেই প্রয়োজন নজরদারি
অভিযানের অংশ হিসেবে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র ও বাগান নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে খোলা জায়গায় পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, ডাবের খোসা কিংবা পানি জমতে পারে এমন সামগ্রী ফেলে না রাখার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
এডিস মশার প্রজননস্থল সব সময় বড় জলাশয় বা দৃশ্যমান আবর্জনার স্তূপে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা ছোট পাত্র কিংবা ছাদে জমে থাকা সামান্য পানিও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ি ও আশপাশ ভালোভাবে পরীক্ষা করা, বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং পানির পাত্র ঢেকে রাখা বা নিয়মিত পরিষ্কার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অভিযানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন
পৌরসভার টিম-৪-এর এ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা গণপূর্ত দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার দেব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মো. ইমরান হোসাইন এবং দৈনিক চাঁপাই দর্পণের প্রতিনিধি মো. ইসাহাক আলী।
এ ছাড়া পৌরসভার অফিস সহকারী মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বিল ক্লার্ক মো. সেরাজুল ইসলাম, ইউসুফ, ফয়সল, মেহেদী, আরাফাত ও আফজালসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। রেড ক্রিসেন্টের সদস্য মোসা. তানজিলা খাতুন, মো. এ্যানি খাতুন ও মোসা. খুসি আরা খাতুনসহ স্থানীয় বাসিন্দারাও এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন।
ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং বমিভাব দেখা দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে নিজে থেকে ওষুধ সেবন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এক দিনের অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত কার্যক্রম
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভার এ ধরনের অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও নজরদারি প্রয়োজন। বাড়ি, দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল দ্রুত অপসারণে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
পাশাপাশি পৌর কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং নাগরিকদের অভিযোগের দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো এলাকায় বারবার পানি জমলে সাময়িকভাবে পানি সরানোর পাশাপাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধানও খুঁজে বের করতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে পৌরসভার উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের দৈনন্দিন সচেতনতাই হতে পারে কার্যকর প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুললে সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 






















