ঢাকা ০২:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
এক দিনে ঝরল ১০ প্রাণ

তাপপ্রবাহের দাপটের মধ্যেই বজ্রপাতের বিভীষিকা

সংগৃহীত ছবি।

দেশজুড়ে দাবদাহের দমবন্ধ করা গরমের মধ্যে হঠাৎ আকাশজুড়ে কালো মেঘ। তারপরই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক। মুহূর্তেই আকাশ চিরে নেমে আসে বজ্রপাতের ভয়ংকর আগুন। কোথাও মাঠে ধান কাটছিলেন কৃষক, কোথাও গরু আনতে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ কৃষক, আবার কোথাও স্কুলপড়ুয়া শিশু খেলছিল বাড়ির পাশে। এক ঝলক বজ্রের নির্মম আঘাতে থেমে গেছে তাদের জীবন। শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাত ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ আগামী আরও চার থেকে পাঁচ দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আগামী বৃহস্পতিবারের পর তাপমাত্রা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

শুক্রবার দেশের ১৩ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। রাজশাহী ও বাগেরহাটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া সাতক্ষীরায় ৩৬ দশমিক ৮, পটুয়াখালীতে ৩৬ দশমিক ৭, যশোর, ফেনী ও বান্দরবানে ৩৬ দশমিক ৬, নোয়াখালীতে ৩৬ দশমিক ৫ এবং মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। মোংলা ও রামগতিতেও দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি।

রাজধানী ঢাকাতেও ছিল অস্বস্তিকর গরম। সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ থাকলেও দুপুরের পর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির পরও কমেনি ভ্যাপসা গরম। বৃহস্পতিবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, শুক্রবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রিতে।

আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক জানান, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বেশি ভ্যাপসা গরম অনুভব করছে। আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় ভারী বর্ষণ ও বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি খোলা মাঠ, জলাশয় ও উঁচু স্থানে অবস্থানকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

এদিকে শুক্রবারের বজ্রপাত যেন একেকটি পরিবারে নামিয়ে এনেছে শোকের কালো ছায়া। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে জমিতে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান কৃষক মো. মালেক (৪০)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আচমকা বিকট শব্দে বজ্রপাত হলে মাঠজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে নিহত হন কৃষক ইদ্রিস আলী ফকির (৬৫)। ভোলার লালমোহনে বজ্রপাত কেড়ে নেয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়ামিনের (১১) প্রাণ। পরিবারের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে চা বাগানে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে মারা যান শ্রমিক স্বপন মুণ্ডা (২৩)। একই জেলার রাজনগরে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে প্রাণ হারান কৃষক তালেব মিয়া (৪০)। নেত্রকোনার আটপাড়ায় বজ্রপাতে নিহত হন সোলায়মান মিয়া (২২)। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জেও বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছে ফয়সাল বেপারী (৩৫) নামের এক ব্যক্তির।

অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় পৃথক ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন হৃদয় হোসেন (২২) ও আশরাফ আলী (২৭) নামে দুই যুবক।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসের শুরুতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত থাকায় তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় এবং রোদের তীব্রতা বাড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। গত বুধবার চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো তাপপ্রবাহ শুরু হয়, যা এখন ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।

বজ্রপাতের বিকট শব্দ আর বিদ্যুতের ঝলকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। তাই আবহাওয়া খারাপ হলে অপ্রয়োজনে খোলা মাঠে অবস্থান না করা, মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

হিটু শেখের ফাঁসি দ্রুত কার্যকরের দাবি পরিবারের

এক দিনে ঝরল ১০ প্রাণ

তাপপ্রবাহের দাপটের মধ্যেই বজ্রপাতের বিভীষিকা

প্রকাশের সময়ঃ ০১:০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

দেশজুড়ে দাবদাহের দমবন্ধ করা গরমের মধ্যে হঠাৎ আকাশজুড়ে কালো মেঘ। তারপরই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক। মুহূর্তেই আকাশ চিরে নেমে আসে বজ্রপাতের ভয়ংকর আগুন। কোথাও মাঠে ধান কাটছিলেন কৃষক, কোথাও গরু আনতে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ কৃষক, আবার কোথাও স্কুলপড়ুয়া শিশু খেলছিল বাড়ির পাশে। এক ঝলক বজ্রের নির্মম আঘাতে থেমে গেছে তাদের জীবন। শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাত ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ আগামী আরও চার থেকে পাঁচ দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আগামী বৃহস্পতিবারের পর তাপমাত্রা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

শুক্রবার দেশের ১৩ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। রাজশাহী ও বাগেরহাটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া সাতক্ষীরায় ৩৬ দশমিক ৮, পটুয়াখালীতে ৩৬ দশমিক ৭, যশোর, ফেনী ও বান্দরবানে ৩৬ দশমিক ৬, নোয়াখালীতে ৩৬ দশমিক ৫ এবং মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। মোংলা ও রামগতিতেও দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি।

রাজধানী ঢাকাতেও ছিল অস্বস্তিকর গরম। সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ থাকলেও দুপুরের পর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির পরও কমেনি ভ্যাপসা গরম। বৃহস্পতিবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, শুক্রবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রিতে।

আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক জানান, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বেশি ভ্যাপসা গরম অনুভব করছে। আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় ভারী বর্ষণ ও বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি খোলা মাঠ, জলাশয় ও উঁচু স্থানে অবস্থানকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

এদিকে শুক্রবারের বজ্রপাত যেন একেকটি পরিবারে নামিয়ে এনেছে শোকের কালো ছায়া। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে জমিতে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান কৃষক মো. মালেক (৪০)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আচমকা বিকট শব্দে বজ্রপাত হলে মাঠজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে নিহত হন কৃষক ইদ্রিস আলী ফকির (৬৫)। ভোলার লালমোহনে বজ্রপাত কেড়ে নেয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়ামিনের (১১) প্রাণ। পরিবারের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে চা বাগানে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে মারা যান শ্রমিক স্বপন মুণ্ডা (২৩)। একই জেলার রাজনগরে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে প্রাণ হারান কৃষক তালেব মিয়া (৪০)। নেত্রকোনার আটপাড়ায় বজ্রপাতে নিহত হন সোলায়মান মিয়া (২২)। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জেও বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছে ফয়সাল বেপারী (৩৫) নামের এক ব্যক্তির।

অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় পৃথক ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন হৃদয় হোসেন (২২) ও আশরাফ আলী (২৭) নামে দুই যুবক।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসের শুরুতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত থাকায় তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় এবং রোদের তীব্রতা বাড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। গত বুধবার চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো তাপপ্রবাহ শুরু হয়, যা এখন ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।

বজ্রপাতের বিকট শব্দ আর বিদ্যুতের ঝলকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। তাই আবহাওয়া খারাপ হলে অপ্রয়োজনে খোলা মাঠে অবস্থান না করা, মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।