ঢাকা ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুন, নওগাঁর আত্রাইয়ের ৭ প্রবাসীর মৃত্যু বাঁশখালী-মিরসরাই উপকূলে শিল্পায়নের পরিকল্পনা- প্রধানমন্ত্রী সালমান শাহ হত্যা মামলা- কারাগারে খল অভিনেতা ডন চাঁপাইনবাবগঞ্জে জাল টাকা তৈরির কারখানায় র‌্যাবের অভিযান, আটক ২ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত বিদ্যুৎ নিয়ে মন্তব্য ঘিরে বিচারককে ঘেরাও-বিক্ষোভ, এজলাসে ভাঙচুরের অভিযোগ সাপাহার সীমান্তে বিজিবির টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের যাত্রা শুরু বেরোবি সনাতনী বিদার্থী সংসদের নতুন কমিটি, নেতৃত্বে কাকলী-শুভ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সিরাজুল ইসলাম ছিলেন আপসহীন- মির্জা ফখরুল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদ খাতের বিকল্প নেই- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

বিদ্যুৎ নিয়ে মন্তব্য ঘিরে বিচারককে ঘেরাও-বিক্ষোভ, এজলাসে ভাঙচুরের অভিযোগ

বিদ্যুৎ নিয়ে বিচারকের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত চত্বরে উত্তেজনা ও বিক্ষোভের অভিযোগ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত চত্বরে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ২য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. উজ্জল মাহমুদের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎ লোডশেডিং নিয়ে আদালতে দায়িত্ব পালনকালে বিচারকের করা একটি মন্তব্যকে ‘সরকারবিরোধী’ ও ‘কটূক্তিমূলক’ আখ্যা দিয়ে জাতীয়তাবাদী দলের আসামিপক্ষের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন বলে অভিযোগ। পরে বিচারকের খাস কামরা ও এজলাস কক্ষের দরজা-জানালার কাঁচ ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর সংক্ষিপ্ত পথসভা থেকে জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. উজ্জল মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও অপসারণের দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় আদালত চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় অসুবিধার কথা উল্লেখ করে বিচারক কেবল বিষয়টি দেখার অনুরোধ করেছিলেন। এ নিয়ে সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি অবমাননাকর কিংবা কটূক্তিমূলক কোনো মন্তব্য করেননি।


এদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ঘটনাটিকে আদালত প্রাঙ্গণে ‘মব সৃষ্টি’ হিসেবে অভিহিত করে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত পিপি বলেছেন, ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতরা জাতীয়তাবাদী দলের কেউ নন; তারা বহিরাগত হতে পারেন বলে তিনি দাবি করেন।
জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে শুরু ঘটনার সূত্রপাত
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. রফিকুল ইসলাম টিপু জানান, একটি মামলায় পাঁচজন আসামি নির্ধারিত তারিখে আদালতে অনুপস্থিত থাকায় বিজ্ঞ আদালত তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলা নম্বর ১১৪/২৪ এসটিসি।


গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ পাঁচ আসামির মধ্যে আনোয়ার হোসেন তুফানকে গত শনিবার, ৮ আগস্ট গ্রেপ্তার করে। পরদিন রবিবার বাকি চার আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে বিজ্ঞ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
আইনজীবী টিপুর ভাষ্য অনুযায়ী, জামিন মঞ্জুরের আদেশের পর এজলাস কক্ষে উপস্থিত কয়েকজন ছবি তুলতে চাইলে বিজ্ঞ বিচারক আদালত কক্ষে ছবি তোলা নিষিদ্ধ বলে জানান। এ সময় আসামিপক্ষ তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট আদালতের একজন কর্মচারী জানান, আদালতের এজলাস কক্ষে বিদ্যুৎ না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিচারক ও আদালতসংশ্লিষ্টদের অসুবিধা হচ্ছিল। তার দাবি, আসামিপক্ষ রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার পর বিচারক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনি যেহেতু বর্তমান সরকারি দলের লোক, তাহলে বিদ্যুতের বিষয়টা একটু দেখবেন? আমরা আদালতের এজলাস কক্ষে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি।’
এই বক্তব্যের পরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। একপর্যায়ে আসামিপক্ষের একজন সমর্থক বিচারককে উদ্দেশ্য করে, ‘আপনার বাড়ি কি গোপালগঞ্জ?’—এমন প্রশ্ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর এজলাস কক্ষে হৈচৈ, হট্টগোল এবং ভাঙচুর শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দফার ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে দ্বিতীয় দফায়ও কয়েকজন দলবল নিয়ে আদালত ভবনে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
একপর্যায়ে আদালত চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বাবর আলী রুমন সাংবাদিকদের বলেন, বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা একটি ‘মিথ্যা মামলায়’ তাদের পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর মধ্যে আনোয়ার হোসেন তুফানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং বাকি চারজন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে তারা জামিন পান।
তিনি দাবি করেন, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিজ্ঞ বিচারককে জানান যে, মামলাটি বিগত সরকারের সময়ে পুলিশের দায়ের করা মামলা এবং ওই মামলায় একজন আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
তার ভাষ্য, ‘আমার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিচারক আমাকে বলেন, আপনার সরকার কী করছে, কারেন্ট থাকে না?’
বাবর আলী রুমনের দাবি, বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের মন্তব্য করায় তিনি তা কটূক্তিমূলক হিসেবে মনে করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ঘটনার পর অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত পথসভায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মীম ফজলে আজিম বলেন, একজন বিচারকের কাছ থেকে দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও সংযত আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো রাজনৈতিক নেতা, সরকার বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়ে থাকলে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।


তিনি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. উজ্জল মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও অপসারণের দাবি জানান। অন্যথায় আদালত চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তিনি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ২য় আদালতের এজলাস কক্ষে কে বা কারা ভাঙচুর করেছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
তিনি বলেন, ‘তবে আসামিরা কোনো ভাঙচুর করেনি। তারা এজলাস কক্ষে উপস্থিত ছিল।’
বিচারক বিদ্যুৎ না থাকা নিয়ে সরকারকে উদ্দেশ্য করে কোনো কটূক্তি করেছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তার জানামতে বিজ্ঞ বিচারক কোনো কটূক্তিমূলক মন্তব্য করেননি।
অ্যাডভোকেট টিপু আরও বলেন, আসামিরা তাদের রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার পর বিচারক শুধু বলেন যে, আদালতে বিদ্যুৎ থাকে না এবং বিষয়টি একটু দেখার জন্য অনুরোধ করেন। এর বাইরে বিচারক অন্য কোনো রাজনৈতিক বা অবমাননাকর মন্তব্য করেননি বলে তিনি জানান।


‘এটি আদালতে মব সৃষ্টির ঘটনা’—আইনজীবী সমিতি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আবু হাসিব বলেন, আদালত চত্বরে এবং এজলাস কক্ষে দুই থেকে তিন দফায় যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ‘এটি আদালত প্রাঙ্গণে মব সৃষ্টি করার ঘটনা। এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
তিনি আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ, বিচারিক কার্যক্রম এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
‘ভাঙচুরকারীরা বিএনপির কেউ নয়, বহিরাগত হতে পারে’—পিপি
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল ওদুদ বলেন, দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত চত্বরে এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ২য় আদালতের ভবন ও এজলাস কক্ষের দরজা-জানালায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি শুনেছেন।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা জাতীয়তাবাদী দলের কেউ নয়। তারা বহিরাগত হতে পারে।’
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

 


আদালতের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন
ঘটনাটি নিয়ে আদালত অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। একদিকে বিচারকের মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা অবমাননাকর বক্তব্যের অভিযোগ তুলে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে আদালতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও আইনজীবীর দাবি, বিচারক কেবল বিদ্যুৎ না থাকার কারণে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় যে সমস্যা হচ্ছিল, সে বিষয়টি দেখার অনুরোধ করেছিলেন; সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি কটূক্তিমূলক বক্তব্য দেননি।
আইনসংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারকের বক্তব্য নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইন ও বিচার বিভাগের নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপস্থাপন ও নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিচারালয় বা এজলাস কক্ষে হট্টগোল, ভীতি সৃষ্টি কিংবা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটলে তা আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও বিচার প্রশাসনের পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে।


ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং বিচারকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বাস্তবতা কতটুকু—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
প্রসঙ্গত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আদালতের শৃঙ্খলা ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি কোনো বিচারকের আচরণ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগও প্রচলিত আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধি অনুসরণ করে যাচাই ও নিষ্পত্তির বিষয়। তাই এ ঘটনায় উত্থাপিত সব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগকে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন আইনসংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুন, নওগাঁর আত্রাইয়ের ৭ প্রবাসীর মৃত্যু

বিদ্যুৎ নিয়ে মন্তব্য ঘিরে বিচারককে ঘেরাও-বিক্ষোভ, এজলাসে ভাঙচুরের অভিযোগ

প্রকাশের সময়ঃ ১২:৩০:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত চত্বরে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ২য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. উজ্জল মাহমুদের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎ লোডশেডিং নিয়ে আদালতে দায়িত্ব পালনকালে বিচারকের করা একটি মন্তব্যকে ‘সরকারবিরোধী’ ও ‘কটূক্তিমূলক’ আখ্যা দিয়ে জাতীয়তাবাদী দলের আসামিপক্ষের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন বলে অভিযোগ। পরে বিচারকের খাস কামরা ও এজলাস কক্ষের দরজা-জানালার কাঁচ ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর সংক্ষিপ্ত পথসভা থেকে জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. উজ্জল মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও অপসারণের দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় আদালত চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় অসুবিধার কথা উল্লেখ করে বিচারক কেবল বিষয়টি দেখার অনুরোধ করেছিলেন। এ নিয়ে সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি অবমাননাকর কিংবা কটূক্তিমূলক কোনো মন্তব্য করেননি।


এদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ঘটনাটিকে আদালত প্রাঙ্গণে ‘মব সৃষ্টি’ হিসেবে অভিহিত করে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত পিপি বলেছেন, ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতরা জাতীয়তাবাদী দলের কেউ নন; তারা বহিরাগত হতে পারেন বলে তিনি দাবি করেন।
জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে শুরু ঘটনার সূত্রপাত
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. রফিকুল ইসলাম টিপু জানান, একটি মামলায় পাঁচজন আসামি নির্ধারিত তারিখে আদালতে অনুপস্থিত থাকায় বিজ্ঞ আদালত তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলা নম্বর ১১৪/২৪ এসটিসি।


গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ পাঁচ আসামির মধ্যে আনোয়ার হোসেন তুফানকে গত শনিবার, ৮ আগস্ট গ্রেপ্তার করে। পরদিন রবিবার বাকি চার আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে বিজ্ঞ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
আইনজীবী টিপুর ভাষ্য অনুযায়ী, জামিন মঞ্জুরের আদেশের পর এজলাস কক্ষে উপস্থিত কয়েকজন ছবি তুলতে চাইলে বিজ্ঞ বিচারক আদালত কক্ষে ছবি তোলা নিষিদ্ধ বলে জানান। এ সময় আসামিপক্ষ তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট আদালতের একজন কর্মচারী জানান, আদালতের এজলাস কক্ষে বিদ্যুৎ না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিচারক ও আদালতসংশ্লিষ্টদের অসুবিধা হচ্ছিল। তার দাবি, আসামিপক্ষ রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার পর বিচারক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনি যেহেতু বর্তমান সরকারি দলের লোক, তাহলে বিদ্যুতের বিষয়টা একটু দেখবেন? আমরা আদালতের এজলাস কক্ষে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি।’
এই বক্তব্যের পরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। একপর্যায়ে আসামিপক্ষের একজন সমর্থক বিচারককে উদ্দেশ্য করে, ‘আপনার বাড়ি কি গোপালগঞ্জ?’—এমন প্রশ্ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর এজলাস কক্ষে হৈচৈ, হট্টগোল এবং ভাঙচুর শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দফার ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে দ্বিতীয় দফায়ও কয়েকজন দলবল নিয়ে আদালত ভবনে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
একপর্যায়ে আদালত চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বাবর আলী রুমন সাংবাদিকদের বলেন, বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা একটি ‘মিথ্যা মামলায়’ তাদের পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর মধ্যে আনোয়ার হোসেন তুফানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং বাকি চারজন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে তারা জামিন পান।
তিনি দাবি করেন, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিজ্ঞ বিচারককে জানান যে, মামলাটি বিগত সরকারের সময়ে পুলিশের দায়ের করা মামলা এবং ওই মামলায় একজন আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
তার ভাষ্য, ‘আমার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিচারক আমাকে বলেন, আপনার সরকার কী করছে, কারেন্ট থাকে না?’
বাবর আলী রুমনের দাবি, বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের মন্তব্য করায় তিনি তা কটূক্তিমূলক হিসেবে মনে করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ঘটনার পর অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত পথসভায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মীম ফজলে আজিম বলেন, একজন বিচারকের কাছ থেকে দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও সংযত আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো রাজনৈতিক নেতা, সরকার বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়ে থাকলে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।


তিনি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. উজ্জল মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও অপসারণের দাবি জানান। অন্যথায় আদালত চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তিনি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ২য় আদালতের এজলাস কক্ষে কে বা কারা ভাঙচুর করেছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
তিনি বলেন, ‘তবে আসামিরা কোনো ভাঙচুর করেনি। তারা এজলাস কক্ষে উপস্থিত ছিল।’
বিচারক বিদ্যুৎ না থাকা নিয়ে সরকারকে উদ্দেশ্য করে কোনো কটূক্তি করেছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তার জানামতে বিজ্ঞ বিচারক কোনো কটূক্তিমূলক মন্তব্য করেননি।
অ্যাডভোকেট টিপু আরও বলেন, আসামিরা তাদের রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার পর বিচারক শুধু বলেন যে, আদালতে বিদ্যুৎ থাকে না এবং বিষয়টি একটু দেখার জন্য অনুরোধ করেন। এর বাইরে বিচারক অন্য কোনো রাজনৈতিক বা অবমাননাকর মন্তব্য করেননি বলে তিনি জানান।


‘এটি আদালতে মব সৃষ্টির ঘটনা’—আইনজীবী সমিতি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আবু হাসিব বলেন, আদালত চত্বরে এবং এজলাস কক্ষে দুই থেকে তিন দফায় যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ‘এটি আদালত প্রাঙ্গণে মব সৃষ্টি করার ঘটনা। এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
তিনি আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ, বিচারিক কার্যক্রম এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
‘ভাঙচুরকারীরা বিএনপির কেউ নয়, বহিরাগত হতে পারে’—পিপি
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল ওদুদ বলেন, দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত চত্বরে এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ২য় আদালতের ভবন ও এজলাস কক্ষের দরজা-জানালায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি শুনেছেন।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা জাতীয়তাবাদী দলের কেউ নয়। তারা বহিরাগত হতে পারে।’
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

 


আদালতের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন
ঘটনাটি নিয়ে আদালত অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। একদিকে বিচারকের মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা অবমাননাকর বক্তব্যের অভিযোগ তুলে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে আদালতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও আইনজীবীর দাবি, বিচারক কেবল বিদ্যুৎ না থাকার কারণে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় যে সমস্যা হচ্ছিল, সে বিষয়টি দেখার অনুরোধ করেছিলেন; সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি কটূক্তিমূলক বক্তব্য দেননি।
আইনসংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারকের বক্তব্য নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইন ও বিচার বিভাগের নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপস্থাপন ও নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিচারালয় বা এজলাস কক্ষে হট্টগোল, ভীতি সৃষ্টি কিংবা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটলে তা আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও বিচার প্রশাসনের পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে।


ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং বিচারকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বাস্তবতা কতটুকু—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
প্রসঙ্গত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আদালতের শৃঙ্খলা ও বিচারিক মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি কোনো বিচারকের আচরণ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগও প্রচলিত আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধি অনুসরণ করে যাচাই ও নিষ্পত্তির বিষয়। তাই এ ঘটনায় উত্থাপিত সব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগকে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন আইনসংশ্লিষ্টরা।