ঢাকা ০৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ তাহসিফ হত্যা মামলা: দীপকে ফের ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ শেখ হাসিনা বেঁচে থাকা পর্যন্ত অস্থিতিশীলতার চেষ্টা চলবে: তথ্য উপদেষ্টা ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ: বিজ্ঞানমন্ত্রী মজুরি কমিশন গঠন হয়েছে, এখন আন্দোলনের সুযোগ নেই: প্রতিমন্ত্রী টুকু মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে অরাজকতার চেষ্টা, রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ডিএনসিসি প্রশাসকের শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি, সতর্ক বিএনপি নেতাকর্মীরাও মিরপুর-১১-তে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, যান চলাচল স্বাভাবিক; আটক ৪ এইচএসসিতে শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে, শাস্তির মুখে শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানপ্রধান গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১

কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ প্রমাণিত, হাসপাতালে ভর্তির সঙ্গে যোগসূত্র অনিশ্চিত

জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা থাকা অবস্থায় চাঁপাইনবাগঞ্জ সদর উপজেলা চত্তরে বন্ধুদের সাথে তোলা । সংগৃহীত ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত রহমানকে শারীরিকভাবে মারধরের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. কাওসার আজমের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে মারধরের ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র অবশ্য নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত কমিটি। এদিকে, শিক্ষার্থীর উন্নত চিকিৎসায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। অভিযুক্ত শিক্ষককে ইতোমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের নির্দেশনায় পরিচালিত তদন্তে শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগের সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি।

টিজ করার অভিযোগে শিক্ষার্থীকে মারধর
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার দিন ১৭/০৯/২৬ তারিখ শিক্ষক কাওসার আজম অষ্টম শ্রেণির পাশের একটি শ্রেণিতে পাঠদান করতে যাওয়ার সময় এক শিক্ষার্থী তাঁকে ‘বাংলার খ্যাপা’ বলে টিজ করে। ওই সময় আরাফাত রহমানসহ আরও দুই-তিনজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিল।
শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী, আরাফাতও তাঁকে টিজ করেন এবং অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আরাফাতকে মারধর করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আরাফাত রহমান শিক্ষকের বিরুদ্ধে টিজ বা উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। সরেজমিন তদন্তে অষ্টম শ্রেণির ‘ক’ শাখার শিক্ষার্থীরাও শিক্ষক কাওসার আজমের বিরুদ্ধে আরাফাতকে মারধরের অভিযোগের সত্যতা সমর্থন করে।
তদন্ত কমিটির সুস্পষ্ট মতামতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী আরাফাত রহমানকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে অভিযুক্ত খণ্ডকালীন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

হাসপাতালে ভর্তি নিয়ে নিশ্চিত নয় তদন্ত
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান ও তাঁর মা ইলমা জাহান অভিযোগ করেন, ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাসহ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা মারধরের ঘটনা সত্য বলে স্বীকার করলেও তাঁদের বক্তব্য ছিল, আঘাত গুরুতর বা আশঙ্কাজনক মনে না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

১৮ তারিখ রাতে পিকনিকের ছবি।

শিক্ষার্থীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে আরাফাতের বন্ধুরা তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিকনিক করতে যায়। রাতে পিকনিক শেষে সে বাড়িতে ফিরে আসে। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর তার নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
আরাফাতের মা ইলমা জাহান বলেন, “আমার ছেলেকে অতিথি শিক্ষক কাওসার আজম মেরেছিলেন, বিষয়টি আমরা তখন জানতাম না। ১৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পরদিন শুক্রবার রাতে আরাফাতকে তার বন্ধুরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিকনিক করতে যায়। অনেক রাতে সে বাড়ি ফেরে। ১৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ তার নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? সে কিছু বলেনি। পরে তার আরেক বন্ধু আমাকে জানায়, ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার স্কুলে কাওসার স্যার আরাফাতকে মেরেছেন।”
পরিবারের পক্ষ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর সকালে আরাফাতকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে শিক্ষক কর্তৃক মারধরের কারণেই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার খোঁজখবর নেয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকরা হাসপাতালে গিয়ে আরাফাতের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
আরাফাতের মা ইলমা জাহান বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মাইক্রোবাসে করে আরাফাতকে রাজশাহীতে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, “রাজশাহী ইসলামী হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার ছেলের চিকিৎসা করানো হয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী পর্যন্ত চিকিৎসার যাবতীয় খরচ স্কুলের স্যারেরা দিয়েছেন। ইউএনও স্যারও ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। আমার ছেলে আরাফাতকে মারধরের বিষয়ে স্কুলের স্যারদের প্রতি আমার কোনো দাবি নেই।”

উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নেওয়া হয়

কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বর আরাফাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পেয়ে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, তিনি নিজে এবং সহকারী শিক্ষকরা হাসপাতালে গিয়ে তার খোঁজখবর নেন।

প্রধান শিক্ষক বলেন, “পরবর্তীতে ২৪ সেপ্টেম্বর আরাফাতের উন্নত চিকিৎসার জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শফিউর রহমান, সহকারী শিক্ষক মো. আতাউর রহমান, মো. খালেদ বিন অলীদ ও অফিস সহায়ক মো. আবুল হায়াত তাকে রাজশাহীতে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ৪/১০/২০২৬ তারিখ তাকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী পর্যন্ত চিকিৎসা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ শিক্ষার্থীর পেছনে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. কাওসার আজমের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থী আরাফাত রহমানকে মারধরের বিষয়টি জানার পর বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ওই শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীর চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল মতিন জানান, আরাফাত রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে আরাফাতের চিকিৎসার সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল। আমিও নিজে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তাকে দেখেছি।”

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, মারধরের ঘটনা ঘটে ১৭ সেপ্টেম্বর, আর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ২০ সেপ্টেম্বর। মাঝের সময়ে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষার্থী বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়েছিল। তাহলে তিন দিন পর হাসপাতালে ভর্তির কারণ কি মারধর, নাকি অন্য কিছু?

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ

কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ প্রমাণিত, হাসপাতালে ভর্তির সঙ্গে যোগসূত্র অনিশ্চিত

প্রকাশের সময়ঃ ১২:৩৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত রহমানকে শারীরিকভাবে মারধরের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. কাওসার আজমের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে মারধরের ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র অবশ্য নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত কমিটি। এদিকে, শিক্ষার্থীর উন্নত চিকিৎসায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। অভিযুক্ত শিক্ষককে ইতোমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের নির্দেশনায় পরিচালিত তদন্তে শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগের সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি।

টিজ করার অভিযোগে শিক্ষার্থীকে মারধর
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার দিন ১৭/০৯/২৬ তারিখ শিক্ষক কাওসার আজম অষ্টম শ্রেণির পাশের একটি শ্রেণিতে পাঠদান করতে যাওয়ার সময় এক শিক্ষার্থী তাঁকে ‘বাংলার খ্যাপা’ বলে টিজ করে। ওই সময় আরাফাত রহমানসহ আরও দুই-তিনজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিল।
শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী, আরাফাতও তাঁকে টিজ করেন এবং অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আরাফাতকে মারধর করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আরাফাত রহমান শিক্ষকের বিরুদ্ধে টিজ বা উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। সরেজমিন তদন্তে অষ্টম শ্রেণির ‘ক’ শাখার শিক্ষার্থীরাও শিক্ষক কাওসার আজমের বিরুদ্ধে আরাফাতকে মারধরের অভিযোগের সত্যতা সমর্থন করে।
তদন্ত কমিটির সুস্পষ্ট মতামতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী আরাফাত রহমানকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে অভিযুক্ত খণ্ডকালীন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

হাসপাতালে ভর্তি নিয়ে নিশ্চিত নয় তদন্ত
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান ও তাঁর মা ইলমা জাহান অভিযোগ করেন, ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাসহ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা মারধরের ঘটনা সত্য বলে স্বীকার করলেও তাঁদের বক্তব্য ছিল, আঘাত গুরুতর বা আশঙ্কাজনক মনে না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

১৮ তারিখ রাতে পিকনিকের ছবি।

শিক্ষার্থীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে আরাফাতের বন্ধুরা তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিকনিক করতে যায়। রাতে পিকনিক শেষে সে বাড়িতে ফিরে আসে। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর তার নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
আরাফাতের মা ইলমা জাহান বলেন, “আমার ছেলেকে অতিথি শিক্ষক কাওসার আজম মেরেছিলেন, বিষয়টি আমরা তখন জানতাম না। ১৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পরদিন শুক্রবার রাতে আরাফাতকে তার বন্ধুরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিকনিক করতে যায়। অনেক রাতে সে বাড়ি ফেরে। ১৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ তার নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? সে কিছু বলেনি। পরে তার আরেক বন্ধু আমাকে জানায়, ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার স্কুলে কাওসার স্যার আরাফাতকে মেরেছেন।”
পরিবারের পক্ষ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর সকালে আরাফাতকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে শিক্ষক কর্তৃক মারধরের কারণেই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার খোঁজখবর নেয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকরা হাসপাতালে গিয়ে আরাফাতের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
আরাফাতের মা ইলমা জাহান বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মাইক্রোবাসে করে আরাফাতকে রাজশাহীতে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, “রাজশাহী ইসলামী হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার ছেলের চিকিৎসা করানো হয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী পর্যন্ত চিকিৎসার যাবতীয় খরচ স্কুলের স্যারেরা দিয়েছেন। ইউএনও স্যারও ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। আমার ছেলে আরাফাতকে মারধরের বিষয়ে স্কুলের স্যারদের প্রতি আমার কোনো দাবি নেই।”

উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নেওয়া হয়

কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বর আরাফাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পেয়ে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, তিনি নিজে এবং সহকারী শিক্ষকরা হাসপাতালে গিয়ে তার খোঁজখবর নেন।

প্রধান শিক্ষক বলেন, “পরবর্তীতে ২৪ সেপ্টেম্বর আরাফাতের উন্নত চিকিৎসার জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শফিউর রহমান, সহকারী শিক্ষক মো. আতাউর রহমান, মো. খালেদ বিন অলীদ ও অফিস সহায়ক মো. আবুল হায়াত তাকে রাজশাহীতে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ৪/১০/২০২৬ তারিখ তাকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী পর্যন্ত চিকিৎসা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ শিক্ষার্থীর পেছনে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. কাওসার আজমের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থী আরাফাত রহমানকে মারধরের বিষয়টি জানার পর বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ওই শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীর চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল মতিন জানান, আরাফাত রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে আরাফাতের চিকিৎসার সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল। আমিও নিজে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তাকে দেখেছি।”

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, মারধরের ঘটনা ঘটে ১৭ সেপ্টেম্বর, আর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ২০ সেপ্টেম্বর। মাঝের সময়ে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষার্থী বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়েছিল। তাহলে তিন দিন পর হাসপাতালে ভর্তির কারণ কি মারধর, নাকি অন্য কিছু?