
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা টিফিনের রুটির ভেতর থেকে একটি ধারালো আস্ত ব্লেড উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও এ ঘটনা সরকারি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মান, তদারকি ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটি উপজেলার কাসেমাবাদ এলাকার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্র, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের স্কুল ফিডিং (টিফিন) কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিনের মতো ওই দিনও শিক্ষার্থীদের মাঝে প্যাকেটজাত রুটি বিতরণ করা হয়। প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রী টিফিন খাওয়ার আগে রুটিটি ছিঁড়তে গিয়ে ভেতরে একটি ধারালো ব্লেড দেখতে পায়। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের জানানো হলে রুটির ভেতর থেকে ব্লেডটি বের করে সবাইকে দেখানো হয়।
শিশুটি অসাবধানতাবশত রুটিটি মুখে দিয়ে ফেললে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারত বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। গলা, মুখগহ্বর কিংবা খাদ্যনালিতে গুরুতর আঘাত এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারত বলে তারা মন্তব্য করেন। তবে সৌভাগ্যক্রমে শিশুটির সতর্কতার কারণে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনার খবর মুহূর্তেই বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেকেই বিদ্যালয়ে ছুটে এসে ঘটনার সত্যতা যাচাই করেন। পরে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরেও আসে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাদ্যে এমন বিপজ্জনক বস্তু পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এটি কোনোভাবেই সাধারণ ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাদ্য প্রস্তুত, প্যাকেজিং ও সরবরাহের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীলদের কঠোর নজরদারি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
একাধিক অভিভাবক বলেন, “আজ একটি শিশু ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু যদি সে ব্লেডটি না দেখে খেয়ে ফেলত, তাহলে এর দায় কে নিত? শিশুদের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা যায় না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরাও বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা। সেখানে যদি খাবারের ভেতর প্রাণঘাতী বস্তু পাওয়া যায়, তাহলে পুরো কর্মসূচির নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তারা খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তদন্তের দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তারা আশা করছেন, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন খাদ্য সরবরাহ কার্যক্রমে মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিভাবক, স্থানীয় সচেতন মহল এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা প্রতিটি খাদ্যসামগ্রীর মান কঠোরভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর পদক্ষেপই এখন অভিভাবকদের প্রধান প্রত্যাশা।
সৈয়দ নূর আহসান, বরিশাল 






















